প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন চরমোনাই পীর

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে সফরটিকে ধর্মীয় প্রচার ও দাওয়াতি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, কয়েক মাস আগে দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের একটি বক্তব্যের সঙ্গে সফরের যোগসূত্র টেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করছেন কেউ কেউ।
চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত রেজাউল করীম গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আন নূর ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ১৪ দিনের সফরে তিনি দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটিতে ধর্মীয় আলোচনা করছেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর মতবিনিময়ের কর্মসূচিও রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের মতে, এ সফরের মধ্য দিয়ে দেশের বাইরে দলটির পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর যে পরিচিতি রয়েছে, সে তুলনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পরিচিতি এখনো সীমিত। সফরের মাধ্যমে সেই অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি সুফি ইসলামের চর্চা ও দর্শন তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আন নূর ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে চরমোনাই পীর যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। দেশটিতে এটি তাঁর প্রথম সফর। সেখানে ইসলামী আন্দোলনের অনুসারীদের পাশাপাশি অন্য দলের লোকজনও তাঁর ধর্মীয় আলোচনা শুনতে আসছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, এর আগে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ সফর করেছেন রেজাউল করীম। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে চরমোনাই পীর হিসেবে ধর্মীয় পরিচিতিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। বিভিন্ন দেশের সুফিবাদের অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি তাঁদের আমন্ত্রণে ধর্মীয় আলোচনা ও দাওয়াতি কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন তিনি।

ফয়জুল করীমের বক্তব্য ঘিরে সমালোচনা
রেজাউল করীমের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে আলোচনার মধ্যে সামনে এসেছে গত ২২ জুলাই বরিশালের গৌরনদীতে ইসলামী যুব আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনে ফয়জুল করীমের দেওয়া বক্তব্য।
ওই সম্মেলনে ইসলামের পক্ষে একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইসলামের পক্ষে একটি বাক্স তৈরির লক্ষ্যেই ইসলামী আন্দোলন জোট করেছিল। ওই জোটের নেতৃত্বে ছিলেন চরমোনাই পীর।
বক্তব্যে ফয়জুল করীম আরও বলেন, ‘আমরা চলতেছিলাম মদিনার দিকে। কিন্তু স্টিয়ারিং ছিনতাই হয়ে গেছে, ডাকাতি হয়ে গেছে। চলতেছিলাম কাফেলা মদিনার দিকে, হঠাৎ দেখি কাফেলা চলতেছে আমেরিকার দিকে। মদিনাওয়ালারা আমেরিকা যেতে পারে না।’
চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফরের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ওই বক্তব্যের সঙ্গে সফরের তুলনা টেনে সমালোচনা করছেন। বাংলাদেশ মাজলিসুল মোফাসসিরিনের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমদ গত ১৪ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘চরমোনাইয়ের পীর সাহেব কি সত্যিই আমেরিকা সফরে যাচ্ছেন? তাহলে তিনি কি আমেরিকামুখী হয়ে গেছেন? জামায়াতের বিরুদ্ধে তো তিনি এমন অভিযোগই করেন।’
তবে এ সমালোচনার সঙ্গে একমত নন ইসলামী আন্দোলনের নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে সফর করা কিংবা সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অর্থ দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতি বা রাজনৈতিক আদর্শ গ্রহণ করা নয়।
দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের ভাষ্য, চরমোনাই পীর যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলেই তিনি দেশটির নীতি গ্রহণ করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, সেখানে রেজাউল করীম কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন না; বরং ধর্মীয় বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যেসব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন
সফরসূচি অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান মুফতি রেজাউল করীম। সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান দারুল উলুম নিউইয়র্কের প্রেসিডেন্ট সরদার বরকাতুল্লাহ, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফকিহ মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ এবং বায়তুল আমান জামে মসজিদের প্রধান ইমাম মাওলানা আজির উদ্দিন।
সফরের প্রথম দিকে ১৪ অক্টোবর আমেরিকান মুসলিম সেন্টারের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। পরদিন পোর্ট ওয়াশিংটন মসজিদে ইসলাহি বয়ান দেন। ১৬ অক্টোবর নিউ জার্সির জালালাবাদ জামে মসজিদে জুমার নামাজের বয়ান ও ইমামতি করেন। একই দিন বায়তুল আমান ইসলামিক সেন্টারে আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলেও বক্তব্য দেন তিনি।
এ ছাড়া নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস মুসলিম সেন্টার, বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টার জামে মসজিদ, ব্রুকলিনের মসজিদ আল-আমান ইনক, জ্যাকসন হাইটসের সানাই পার্টি হল এবং বাফেলোর বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর। মসজিদে কুবায় ইসলাহি বয়ান, বিশেষ ওয়াজ ও দোয়া মাহফিলেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
নিউইয়র্কের দারুল উলুম, মিশিগানের মাসজিদুন নূর এবং আন নূর কালচারাল সেন্টারেও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দলটির নেতারা আশা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এ সফরের মধ্য দিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়বে। অন্যদিকে, সফরকে ঘিরে ফয়জুল করীমের আগের বক্তব্যের সঙ্গে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

