ইলন মাস্কের সঙ্গে ভারতের ঠোকাঠুকি, ঝামেলাটা কোথায়

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই তিক্ততায় রূপ নিয়েছে। ভারতে তার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি ভারত সরকার ও দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘটা এই বিতর্কের আগেও ভারতের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে মাস্কের অসন্তোষ ছিল। সেই কারণেই ভারতে টেসলার কারখানা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ভারতীয় প্রতিভার প্রশংসা করেন। তার সাবেক সঙ্গী ছিলেন অর্ধভারতীয়, যাকে নিয়ে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখরের নামানুসারে নিজের এক সন্তানের নামও রেখেছেন ‘শেখর’। তবে মাস্কের কাজের গতির সঙ্গে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ একেবারেই খাপ খায় না। যদিও মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে বহু দক্ষ ভারতীয় তার সুনজরে রয়েছেন।
যেকোনো সফল উদ্যোক্তার মতোই মাস্ক ভীষণ অধৈর্য। বিশ্বের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তার এই অস্থিরতা অন্যান্য সহকর্মীদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। তিনি প্রতিনিয়ত পুরোনো দেয়াল ভেঙে নতুন সীমানায় পা রাখতে ভালোবাসেন।
প্রথম প্রজন্মের সব উদ্যোক্তাই মূলত অগ্রপথিক। তবে খুব কম মানুষই মাস্কের মতো একসঙ্গে এতগুলো ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পেরেছেন। প্রযুক্তিতে তার বিপ্লবের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি (টেসলা), মহাকাশ থেকে ইন্টারনেট (স্টারলিংক) এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবতরণযোগ্য রকেট (স্পেসএক্স)। যেখানে তিনি প্রথম ছিলেন না, সেখানেও দুঃসাহসী কৌশলে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তীব্র সমালোচনার মুখে টুইটার কিনে নিয়ে তা পরিচালনা করা এর একটি বড় উদাহরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে দেরিতে এলেও তিনি গড়ে তুলেছেন এক্সএআই। টেসলার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও রোবটের সঙ্গে বড় ভাষার মডেল (এলএলএম) যুক্ত করে খুব শিগগির অ্যানথ্রপিক কিংবা ওপেনএআইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন তিনি।
এমনকি সমাজসেবার ক্ষেত্রেও মাস্কের ভাবনা একেবারেই আলাদা। অ্যানথ্রপিক যখন তাদের শেয়ারের পাঁচ শতাংশ জনকল্যাণ তহবিলে দেওয়ার কথা জানায়, তখন মাস্ক ঘোষণা দেন প্রতিটি আমেরিকান শিশুকে তিনি স্পেসএক্সের একটি করে শেয়ার উপহার দেবেন। ১৮ বছরের নিচে থাকা সাত কোটি মার্কিন শিশুর জন্য এই অনুদানের বর্তমান আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার কোটি ডলার। তাঁর রাজনীতি বা দৃষ্টিভঙ্গিও প্রচলিত নিয়মের বাইরের।
মাস্কের এই ক্ষিপ্র ও আগ্রাসী গতির বিপরীতে ভারতের ব্যবস্থা মূলত প্রচুর ধৈর্য ও আনুগত্য দাবি করে। স্টারলিংক নিয়ে সরকারের অবস্থানকে যারা যৌক্তিক বলে তুলে ধরেন, তাদের প্রধান যুক্তি হলো যেকোনো অনুমোদনের জন্য নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং এতে সময় লাগে। ভারতের ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত মানুষের কাছে এটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে একজন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তার চোখে এটি নিছক অযৌক্তিক কালক্ষেপণ। কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা হস্তক্ষেপ ছাড়া একটি ব্যবস্থা কীভাবে এতটা ধীরগতিতে চলতে পারে, তা হয়তো মাস্কের পক্ষে ভাবাই অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে ভারতের দীর্ঘসূত্রতাই দেশটির আসল চেহারা।

