বিদেশে গেলেই ব্যাটিংয়ে ধস, ঘরের মাঠের আড়ালেও কি ঢাকা পড়ছে ব্যর্থতা?

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে হারের পরও দেশের মাটিতে নিজেদের দাপটের গল্পই যেন শেষ ভরসা। জাতীয় দল কেন এমন টানা বাজে খেলছে—এমন প্রশ্নে ব্যাটিংয়ের গভীরের সংকট না খুঁজে উল্টো ঘরের মাঠের সাফল্যকে ঢাল বানালেন তাওহীদ হৃদয়।
সংবাদ সম্মেলনে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে জানতে চাইলে হৃদয় বলেন, ‘কেন খারাপ করছি, এত গভীরভাবে চিন্তা করিনি। দুই সিরিজ আগেও আমরা ঘরের মাঠে ভালো খেলেছি। যে প্রশ্ন করেছেন, আমি একমত যে দেশের বাইরে ভালো খেলছি না।’
দেশের বাইরে যে ব্যাটাররা রান পাচ্ছেন না, তা খালি চোখেই ধরা পড়ছে। তবে হৃদয় দেশের মাটিতে ভালো খেলার কথা বললেও বাস্তব চিত্র পুরোপুরি আলাদা। পরিসংখ্যানে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়, দেশের চেনা পরিবেশ আর বিদেশের কন্ডিশনে ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে রাত-দিনের তফাত তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যানে স্পষ্ট ব্যবধান
লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত কিংবা তাওহীদ হৃদয়দের ব্যাট দেশের মাটিতে যেভাবে চলে, বিদেশের মাটিতে যেন তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। সর্বশেষ ঘরের মাঠে ও বিদেশের মাটিতে খেলা ১০টি করে ওয়ানডে হিসাব করলে রানের এই ফারাক দাঁড়ায় ৪১৪-তে। অর্থাৎ, দেশের বাইরে প্রতি ইনিংসে গড়ে ৪১.৪ রান কম যোগ হয়েছে দলের স্কোরে।
ঘরের মাঠে খেলা সর্বশেষ ১০টি ওয়ানডেতে বাংলাদেশ তুলেছে ২ হাজার ১৫৩ রান। যেখানে ইনিংসপ্রতি গড় ছিল ২১৫.৩ আর রান তোলার গতি ওভারপ্রতি ৫.২৮। বিপরীতে দেশের বাইরে সমানসংখ্যক ম্যাচে ব্যাটাররা করতে পেরেছেন মোটে ১ হাজার ৭৩৯ রান। সেখানে গড় নেমে দাঁড়িয়েছে ১৭৩.৯-এ এবং ওভারপ্রতি রানরেট ৪.৯৩।
ঘরের মাঠেও অস্বস্তি দূর হয়নি
দেশের বাইরে ব্যর্থতার বিপরীতে ঘরের মাঠের যে উদাহরণ টানা হচ্ছে, সেখানেও কিন্তু ব্যাটিং পুরোপুরি নির্ভার ছিল না। নিজেদের মাটিতে টানা চার সিরিজে দল জয় পেলেও ব্যাটিংয়ের অস্বস্তি সব সময়ই তাড়া করেছে। মূলত বোলাররা—বিশেষ করে পেসাররা প্রতিপক্ষকে আটকে দিয়ে ম্যাচ বের করে এনেছেন বলেই ব্যাটারদের দৈন্যদশা আড়ালে চলে গেছে।
ঘরের মাটিতে টানা চার সিরিজের ১২টি ওয়ানডের একটিতেও ৩০০ রানের চৌকাঠ পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ দল। মাত্র পাঁচটি ম্যাচে কোনোমতে ২৫০ রানের কোটা ছোঁয়া সম্ভব হয়েছে। আর চারটি ম্যাচে বাংলাদেশের দলীয় রান ২২৫-এর নিচেই আটকে যায়। বৃষ্টিতে ওভার কাটা যাওয়া ম্যাচগুলোতে তো বাংলাদেশ দুই শর ঘরেই পৌঁছাতে পারেনি।
কাঠগড়ায় বিসিবির পরিকল্পনা ও তৃণমূলের পাইপলাইন
দল যখন বাজে খেলে, তখন মাঠে এর প্রথম জবাবদিহি করতে হয় অধিনায়ককেই। তবে সেই উত্তরের চেয়েও এখন বড় প্রশ্ন ওঠা উচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচকদের ভূমিকা নিয়ে। জাতীয় দলের জন্য দক্ষ বিকল্প খেলোয়াড় না থাকার যে সংকট, তার দায় নির্বাচকদের পাশাপাশি বোর্ডের কাঁধেই বর্তায়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিসিবির ঝুলিতে ঢুকছে শত কোটি টাকা, ব্যাংকেও হাজার কোটির তহবিল অলস পড়ে আছে। অথচ ক্রিকেটার তৈরি বা তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন মেধা তুলে আনতে বোর্ড কার্যকর কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে বড়সড় সংশয় রয়েছে। খেলোয়াড় তৈরির চেয়ে বোর্ডের দৃষ্টি যেন অবকাঠামো ও স্থাপনা গড়ার দিকেই বেশি নিবদ্ধ।
একটি সিরিজে বাজে ফল হলে ঘরোয়া ক্রিকেট ঢেলে সাজানো কিংবা স্পোর্টিং উইকেটে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার যে আশ্বাস দেওয়া হয়, বাস্তবে তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ফলে বৈশ্বিক মঞ্চে ব্যর্থ হয়ে সেই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা আর দেশের মাটিতে তথাকথিত ‘বাঘ’ সাজার গল্পই বারবার শুনতে হচ্ছে সমর্থকদের।

