মহাষ্টমীতে কুমারী পূজার ভক্তি, মহানবমীতে বিদায়ের সুর: চুয়াডাঙ্গার মণ্ডপ পরিদর্শনে ডিসি ও এসপি

ঢাকের বোল, কাঁসার আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি আর পুরোহিতের চণ্ডীপাঠে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। মহাষ্টমীতে কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এর পরপরই সন্ধিপূজা ও বিশেষ প্রার্থনার আবহে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দেবী বন্দনার এই মাহেন্দ্রক্ষণে চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে জেলার বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার এবং পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার।
‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ’—ভোর থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হয়েছে এই মহামন্ত্র। গতকাল সোমবার দিনভর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে দেবীর চরণে অঞ্জলি দেন ভক্তরা। গঙ্গাজল, চন্দন, ধূপ-দীপ আর পুষ্পমালার নৈবেদ্যে সাজানো হয় পূজাঙ্গন। সকাল থেকেই দেবীর চরণে বিশ্ববাসীর মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা জানান পুণ্যার্থীরা।
দেবীজ্ঞানে কুমারী বন্দনা
মহাষ্টমীর প্রধান আকর্ষণ ছিল কুমারী পূজা। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলে ঋতুমতী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এক থেকে ১৬ বছর বয়সী কন্যাশিশুকে মাতৃরূপে বরণ করে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবীর প্রতীক হিসেবে কুমারীর চরণ গঙ্গাজলে ধৌত করার পর আতপ চাল, চন্দন, দুর্বাঘাস, বেলপাতা ও বস্ত্র অর্পণ করে বিশেষ অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। পরে অগ্নি, জল ও পুষ্পের মাধ্যমে শেষ হয় শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা।
ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, স্বর্গ ও মর্ত্যকে বাঁচাতে কোলাসুরকে বধ করতে দেবী দুর্গা কুমারীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই পৌরাণিক ঘটনার সূত্র ধরেই কন্যারূপে মাতৃশক্তির আরাধনা চলে আসছে। মঠ ও মিশনগুলোতে কুমারী দর্শন ও আশীর্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন হাজারো ভক্ত। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে প্রবেশ করতে দেখা যায়। পঞ্জিকা অনুসারে, এবারের দুর্গোৎসবে দেবীর মর্ত্যে আগমন ও প্রস্থান ঘটছে ঘোড়া ও নৌকায়।
মহানবমীর আবহ ও সন্ধিপূজা
অষ্টমী ও নবমী তিথির মিলনে আয়োজিত হয় সন্ধিপূজা। প্রথা মেনে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে ও ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদন করে এই বিশেষ আরাধনা সম্পন্ন হয়। আজ মহানবমীর দিন অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় বিশেষ প্রার্থনা চলবে। তবে নবমীর এই আলো ঝলমলে আয়োজনের মাঝেই শুরু হয়েছে দেবী বিদায়ের বিষাদের সুর।
দামুড়হুদা ও দর্শনায় জেলা প্রশাসকের পরিদর্শন
পূজার সার্বিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিনে দেখতে সোমবার দামুড়হুদা ও দর্শনা এলাকার পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। রাত আটটার দিকে তিনি দর্শনা সর্বজনীন দুর্গামাতা মন্দির প্রাঙ্গণে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। উৎসব যেন আনন্দমুখর ও সম্প্রীতিপূর্ণ থাকে, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক শারমিন আক্তার, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজ্জাদ হোসেন এবং দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হাসান তনু। এ ছাড়া স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সদরে পুলিশ সুপারের নিরাপত্তা তদারকি
এদিকে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা এলাকার বেশ কয়েকটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সভানেত্রী হাবিবা নুসরাত হক মৌ। তাঁরা মণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা খতিয়ে দেখেন এবং ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে পুলিশ সুপার বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ অক্ষুণ্ণ রেখে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করতে হবে। মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ নিরাপত্তা নিশ্চিতে আয়োজকদের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেন তিনি।
জেলায় ১১৬ মণ্ডপে কড়া পাহারা
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলার চারটি উপজেলায় মোট ১১৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। সেই সঙ্গে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন আয়োজকদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকেরা। এ ছাড়া সাদা পোশাকে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (ডিএসবি) ও ট্রাফিক পুলিশের দল পুরো জেলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে।

