এইচএসসির ফলে চুয়াডাঙ্গার ব্রাইট মডেলে শতভাগ সাফল্য, মেহেরপুরের মড়কা কলেজে শূন্য

সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায় যেমন বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে, তেমনি বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধরে রেখেছে নিজেদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা। মেহেরপুর জেলায় সামগ্রিক পাসের হার নেমে এসেছে ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশে। বিপরীতে চুয়াডাঙ্গা শহরের ‘ব্রাইট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ শতভাগ পাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই উত্তীর্ণ হয়েছেন, যার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ জন। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মেহেরপুরের গাংনীর ‘মড়কা কলেজ’-এ। সেখান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুজন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি, ফলে তাদের পাসের হার শূন্যের কোঠায় নেমেছে।
ফলাফলে মেহেরপুর জেলায় সেরা অবস্থান ধরে রেখেছে গাংনীর ‘সন্ধানী স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। ৯৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ পাসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১২ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। চুয়াডাঙ্গা জেলায় বরাবরের মতো শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ’। প্রতিষ্ঠানটিতে পাসের হার ৮৫ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৫৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে সাধারণ কলেজের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা গেছে নজিরবিহীন ধস। চুয়াডাঙ্গা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার মাত্র ৮ শতাংশ, জীবননগর টেকনিক্যাল স্কুলে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং মেহেরপুরের বিএন কলেজে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ পাসে নেমে আসায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলার সাধারণ কলেজগুলোর চিত্র
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এবার পরীক্ষায় বসেছিলেন মোট ৯১১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৭৭৬ জন এবং অনুত্তীর্ণ হয়েছেন ১৩৫ জন। বিজ্ঞান বিভাগে ৩১৪ জন, মানবিকে ৩৮৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২০৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮৩ জন, মানবিক থেকে ৭০ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ১৮৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১১১ জন (পাসের হার ৬০ দশমিক ৬৬ শতাংশ), এ বিভাগে কেউ জিপিএ-৫ পাননি। মানবিক বিভাগ থেকে ৫২২ জনের মধ্যে ৩২৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন (পাসের হার ৬২ দশমিক ২৬ শতাংশ) এবং জিপিএ-৫ এসেছে ৬টি।
জেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজে ৫৮১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৫৮ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ২৭.১৯%)। বদরগঞ্জ কলেজে ২৩৪ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৯ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ১২.৩৯%)। বড়সলুয়া নিউ মডেল কলেজে ১৫৮ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৪৩ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ২৭.২১%)। তেতুল শেখ কলেজে ২৮৯ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৭০ জন (জিপিএ-৫ সাতজন, পাসের হার ৫৮.৮২%)। জীবননগর ডিগ্রি কলেজে ৩২৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৫৪ জন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৪৭.৬৮%)। জীবননগর সরকারি আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজে ২৯০ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৮২ জন (জিপিএ-৫ ১৭ জন, পাসের হার ৬২.৭৬%)।
এছাড়া উথলী কলেজে ১৪৮ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৪০ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ২৭.০৩%)। আন্দুলবাড়ীয়া কলেজে ৪৩ জনের মধ্যে ৩৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৭৬.৭৪%)। দর্শনা সরকারি কলেজে ৮৭১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৩৯৩ জন (জিপিএ-৫ ১৩ জন, পাসের হার ৪৫.১২%)। কার্পাসডাঙ্গা কলেজে ২৬৩ জনের মধ্যে ৬৯ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ২৬.২৪%)। আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজে ৭২৪ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩৬৩ জন (জিপিএ-৫ ১৮ জন, পাসের হার ৫০.১৪%)। আলমডাঙ্গা মহিলা কলেজে ৩০৮ জনের মধ্যে ৫০ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ১৬.২৩%)।
এমএস জোহা কলেজে ২৯৯ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩৮ জন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ১২.৭১%)। খাসকররা কলেজে ৭৭ জনের মধ্যে ১৭ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ২২.০৮%)। ড. আফসার উদ্দীন কলেজে ৬৩ জনের মধ্যে ১৯ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৩০.১৬%)। নিগার সিদ্দিক কলেজে ২০৯ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২২ জন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ১০.৫৩%)। হোগলডাঙ্গা কলেজে ১৭ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭ জন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৪১.১৮%)। হাটবোয়ালিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫৫ জনের মধ্যে ১০ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ১৮.১৮%) এবং বড়বলদিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১১ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ জন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ২৭.২৭%)।
দামুড়হুদায় বড় ধরনের বিপর্যয়
দামুড়হুদা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দুটি বিদ্যাপীঠে ফলাফল বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেননি। দামুড়হুদা আব্দুল ওদুদ শাহ্ ডিগ্রি কলেজ থেকে ৪৬৯ জন অংশ নিয়ে মাত্র ১১৫ জন পাস করেছেন, ফেল করেছেন ৩৫৪ জন শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠানটিতে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ (তালিকা অনুযায়ী ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ)। অপরদিকে দামুড়হুদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৫ জন পাস করেছেন, অনুত্তীর্ণ হয়েছেন ৩২ জন। পাসের হার নেমেছে ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশে। তদারকির অভাব ও নিয়মিত পাঠদান না হওয়াকেই এমন পরিণতির কারণ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের ফলাফল
আলিম পরীক্ষায় চুয়াডাঙ্গা কামিল মাদরাসায় ৬৩ জনের মধ্যে পাস করেছেন ২১ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ৬৬%)। বদরগঞ্জ বাকি বিল্লাহ কামিল মাদরাসায় ৩৮ জনের মধ্যে ২৭ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ চারজন, পাসের হার ৭১%)। দর্শনা ডিএস ফাজিল মাদরাসায় ৩৬ জনের মধ্যে ১৭ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৪৭.২২%)। কার্পাসডাঙ্গা ফাজিল মাদরাসায় ৪৩ জনের মধ্যে ২০ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ দুজন, পাসের হার ৪৬.৫১%)। নওলামারী আলিম মাদরাসায় ২১ জনের মধ্যে ১০ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৪৭.৬২%)। আলমডাঙ্গা সিদ্দিকিয়া আলিম মাদরাসায় ৩৭ জনের মধ্যে ২১ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৫৬.৭৬%)। ওসমানপুর প্রাগপুর ফাজিল মাদরাসায় ২১ জনের মধ্যে ১৫ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৭১.৪৩%)। কাবিলনগর আলিম মাদরাসায় ২০ জনের মধ্যে ৫ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ২৫%)। হাসাদাহ মডেল কামিল মাদরাসায় ৫০ জনের মধ্যে ৩৪ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ তিনজন, পাসের হার ৬৮%)। জীবননগর থানা আলিম মাদরাসায় ৬৯ জনের মধ্যে ২৪ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ৩৪.৭৮%) এবং আন্দুলবাড়িয়া আশরাফিয়া মাদরাসায় ১৬ জনের মধ্যে ৩ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ নেই, পাসের হার ১৮.৭৫%)।
কারিগরি শাখায় ফলাফল ছিল অনেকটাই হতাশাজনক। চুয়াডাঙ্গা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫০ জনের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৪ জন (৮%)। জীবননগর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৭ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন কেবল ১ জন (৫.৮৮%)। এছাড়া বদরগঞ্জ কলেজে ৬৪ জনের মধ্যে ৩৫ জন পাস করেছেন (৫৫%), আলমডাঙ্গা মহিলা কলেজে ৪১ জনের মধ্যে ১২ জন (২৯.২৬%), এমএস জোহা কলেজে ৬২ জনের মধ্যে ২০ জন (৩২.২৫%), ড. আফছার উদ্দীন কলেজে ৫৮ জনের মধ্যে ৩১ জন (৫৩.৪৪%) এবং নিগার সিদ্দিক কলেজে ১০৭ জনের মধ্যে পাস করেছেন ২৭ জন (২৫.২৩%)। কারিগরির কোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই কেউ জিপিএ-৫ পাননি।
মেহেরপুর জেলার সামগ্রিক চিত্র
মেহেরপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলায় এবার ফলাফল নেমে এসেছে তলানিতে। মোট ১৮টি কলেজ থেকে অংশ নেওয়া ৩ হাজার ৫৯২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১ হাজার ৪৫৭ জন। গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশে। পুরো জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৪২ জন।
জেলায় সর্বোচ্চ ২০টি জিপিএ-৫ এসেছে মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৭৪৭ জনের মধ্যে ৪৩৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন (পাসের হার ৫৭.৯৭%)। শীর্ষ সাফল্যের প্রমাণ রেখে গাংনীর সন্ধানী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৮৮ জনের মধ্যে ৮৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন (জিপিএ-৫ ১২ জন, পাসের হার ৯৬.৫৯%)।
অন্যান্য কলেজের মধ্যে মুজিবনগর আদর্শ মহিলা কলেজে ৬০ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩৩ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ৫৫%)। মেহেরপুর সরকারি কলেজে ৫১৮ জনের মধ্যে ২৪০ জন পাস করেছেন (পাসের হার ৪৬.৩৩%)। গাংনী মহিলা কলেজে ২৮৩ জনের মধ্যে ১২৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন (পাসের হার ৪৫.৫৮%)। গাংনী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৯২ জনের মধ্যে ৩৭ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ চারজন, পাসের হার ৪০.২২%)। গাংনী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৪০৫ জনের মধ্যে ১৫০ জন পাস করেছেন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ৩৭.০৪%)। মুজিবনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজে ২৪১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭৩ জন (জিপিএ-৫ তিনজন, পাসের হার ৩০.২৯%)।
এছাড়া মেহেরপুর পৌর ডিগ্রি কলেজে ৩৯১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১০৫ জন (২৬.৮৫%), বামুন্দি নিশিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৪৭ জনের মধ্যে ৩৭ জন (২৫.১৭%), মহাজনপুর কলেজে ৫৭ জনের মধ্যে ১৪ জন (২৪.৫৬%), জাদুখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৮২ জনের মধ্যে ১৯ জন (জিপিএ-৫ একজন, পাসের হার ২৩.১৭%), তেরাইল কলেজে ৯২ জনের মধ্যে ২১ জন (২২.৮৩%), করমদি কলেজে ১২৫ জনের মধ্যে ২২ জন (১৭.৬০%), কাজিপুর কলেজে ১৭০ জনের মধ্যে ২৯ জন (১৭.০৬%), এআরবি কলেজে ৭৩ জনের মধ্যে ৯ জন (১২.৩৩%) এবং বিএন কলেজে ১৯ জনের মধ্যে পাস করেছেন কেবল একজন (৫.২৬%)। মেহেরপুরের মড়কা কলেজের দুজন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে না পারায় শূন্য পাসের তালিকায় ঠাঁই হয়েছে তাদের।

