তরুণদের বৈশ্বিক জাগরণ: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ক্ষোভের মুখে উদার গণতন্ত্র

আমরা হয়তো এখনো ১৯৬৮ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে পৌঁছাইনি। সে সময় ফ্রান্সের সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এমন এক আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত দ্য গল সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের শেষভাগে এসে বিশ্ব গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্রবিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করছে। প্যারিসের প্লাস দে লা বাস্তিলের ‘জুলাই কলাম’ স্মৃতিস্তম্ভে ফরাসি তরুণদের ওঠার প্রতীকী ঘটনার মধ্য দিয়ে এই তরঙ্গের সূচনা হয়েছে।
ফ্রান্সের এই ঘটনার পর ইতালির রোমে একটি উচ্চবিদ্যালয় দখল করেন শিক্ষার্থীরা। নিজেদের দাবি জানানোর সময় তারা শুরুতেই বলেন, ‘ফ্রান্সের মতো পরিবর্তন চাই।’ বর্তমানে এমন তরুণ বিক্ষোভ ভারত থেকে আলবেনিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে তথাকথিত ‘তেলাপোকা আন্দোলন’ দমনে কঠোর বলপ্রয়োগ করছে সরকার। অন্যদিকে আলবেনিয়ায় প্রায় পাঁচ মাস ধরে রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীরা কেবল দুর্নীতির অবসান নয়, পুরো সরকারের পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন।
সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে সার্বিয়ায়। সেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছে শিক্ষার্থীদের দল ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। তারা শুধু দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে জড়িত সরকারকে হটিয়ে দেয়নি, বরং ভোটে জয়ী হয়ে এখন নতুন সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সার্বিয়ার ইতিহাসে এর আগে এমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি।
স্টুডেন্ট লিস্ট কেবল সার্বিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বই বদলে দিচ্ছে না, বরং সংগঠন পরিচালনার নতুন পদ্ধতিও জনপ্রিয় করে তুলছে। তারা নিজেদের সংগঠনের বাইরে থেকেও উন্মুক্ত গণসমাবেশ ও পর্যায়ক্রমিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ৮৫টি ছাত্র সমাবেশের মাধ্যমে তারা প্রার্থী নির্বাচন করেছে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল অনেক সময় সবাইকে চমকে দিয়েছে। যেমন বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভ্লাদান জোকিচ এই আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সমর্থক ছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি নতুন সরকারে বড় দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু ছাত্র সমাবেশে তিনিও প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হননি।
ক্রোয়েশিয়ার দার্শনিক স্রেৎকো হোরভাট সরাসরি গণতন্ত্র ও যৌথ আত্মসংগঠনের ঐতিহ্যের নিরিখে সার্বিয়ার এই ছাত্র আন্দোলনকে ১৮৭১ সালের ‘প্যারিস কমিউন’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে তাদের তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতি একেবারেই আধুনিক। নির্বাচনী প্রচারের সময় তারা ২৬ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ ইউরো অনুদান সংগ্রহ করেছে।
তরুণদের এই আন্দোলনের ঢেউ অবশ্য হঠাৎ আসেনি। এর আগে ২০২৪ সালে কেনিয়ায় এবং ২০২৫ সালে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মাদাগাস্কার, মরক্কো ও পেরুতে তরুণদের বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে। সার্বিয়ার তৃণমূলভিত্তিক এই মডেল অন্য দেশের তরুণ আন্দোলনকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে ফ্রান্সের নঁত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অলিভিয়ে এর্টশাইদের মতে, তরুণদের মধ্যে নিজস্ব পরিচয় ও সামাজিক মেলবন্ধনের অনুভূতি দারুণভাবে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনকারীদের মধ্যে এই যৌথ পরিচয়বোধ গড়ে তুলতে এবং বিক্ষোভের গতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে শিক্ষা খাতের বরাদ্দের দাবিতে বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, গ্রিস ও ইতালিতে বিক্ষোভ করেছেন তরুণেরা। জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আশঙ্কায় এবং স্পেন ও পর্তুগালে সাশ্রয়ী আবাসনের সংকটের বিরুদ্ধে তরুণেরা রাজপথে নেমেছেন। তবে এই আন্দোলন শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই। দূষণের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ায়, অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় এবং বাজেট বরাদ্দে কাটছাঁটের বিরুদ্ধে চিলি ও কলম্বিয়ায় বিক্ষোভ চলছে। গত সপ্তাহান্তে জার্মানিতে ‘জেন জি রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠন একযোগে ২১টি শহরে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছে।
চলতি নভেম্বর মাসে এই আন্দোলন আরও তীব্র হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় আগামী ১১ নভেম্বর বড় ধরনের ছাত্রবিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র ইউনিয়নগুলো।
কয়েক বছর আগে আমি তরুণ কর্মীদের নতুন একটি প্রজন্ম নিয়ে লিখেছিলাম। সেখানে বাংলাদেশের স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই এবং তাদের ‘বাল্যবিবাহমুক্ত এলাকা’ গড়ে তোলার কথা ছিল। ছিল শিক্ষা অধিকারের দাবিতে নাইজেরিয়াসহ আফ্রিকার তরুণদের সংগ্রামের গল্পও। কিন্তু বর্তমানের এই তারুণ্যের বিদ্রোহ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক বৈশ্বিক পরিবেশে এই বিক্ষোভগুলো ছড়িয়ে পড়ছে। এখানে তরুণেরা শুধু শিক্ষার বিষয় নিয়ে নয়, আরও গভীর সংকট নিয়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছেন।

