বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা: সংকট উত্তরণ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি—কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বলতা ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূলনীতির ব্যর্থতা প্রমাণ করে না। বরং এর মাধ্যমে বোঝা যায়, শরিয়তের নির্দেশনার পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কতটা অপরিহার্য।
ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান সংকট
১. খেলাপি বিনিয়োগ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
ইসলামি ব্যাংকিংয়ে অর্থায়নকে অনেক সময় ‘বিনিয়োগ’ বলা হলেও বাস্তবে ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। যথাযথ যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থায়ন, গ্রহীতার সক্ষমতা মূল্যায়নে দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত অর্থায়ন ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে ব্যাংকের আয় কমে, প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন বাড়ে এবং নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়।
২. তারল্যসংকট ও আমানতকারীদের আস্থার অবক্ষয়
ব্যাংকের একটি মৌলিক দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বিনিয়োগ থেকে অর্থ সময়মতো ফেরত না আসা, অতিরিক্ত অর্থায়ন, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আস্থার সংকটের কারণে ব্যাংক তারল্যচাপে পড়তে পারে। আমানতকারীরা যখন ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হন, তখন একসঙ্গে বিপুল অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা দেখা দেয়, যা সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
৩. করপোরেট সুশাসনের অভাব
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, নিরীক্ষা বিভাগ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের মধ্যে দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন না থাকলে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হলে স্বার্থের সংঘাত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়ে। ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা, স্বাধীন পরিচালকের কার্যকর ভূমিকা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা তাই অপরিহার্য।
৪. শরিয়াহ পরিপালনের দুর্বলতা
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিশেষ পরিচয় হলো শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু কোনো ব্যাংক শুধু ইসলামি পরিভাষা ব্যবহার করলেই তার সব কার্যক্রম শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না। চুক্তির বাস্তবতা, পণ্যের মালিকানা, ঝুঁকি বণ্টন এবং লেনদেনের প্রকৃত কাঠামো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শরিয়তের তদারকি যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৫. দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি
ইসলামি অর্থায়নের বিভিন্ন পদ্ধতি পরিচালনার জন্য ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, আইন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শরিয়াহ বিষয়ে সমন্বিত দক্ষতা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের অভাব থাকলে পণ্যের নকশা ও ঝুঁকি মূল্যায়নে দুর্বলতা দেখা দেয়। অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও সাইবার সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকলে আধুনিক গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

