শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের বাঁকবদলে রাষ্ট্রগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদক০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
ইতিহাসের বাঁকবদলে রাষ্ট্রগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু তারিখ শুধু একটি দিনের ঘটনাপ্রবাহকে ধারণ করে না, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ পথচলার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান নতুন মাত্রা লাভ করে এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ভিন্ন ধারার সূচনা ঘটে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বহুমাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। এমন এক অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বর সেনাসদস্যদের বিদ্রোহ তাকে মুক্ত করে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মোড় আনে।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু সামরিক ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসানের আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় জীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। অবশ্য এই ঘটনাপ্রবাহে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির নিজস্ব লক্ষ্যও সক্রিয় ছিল এবং কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার প্রাণহানির মতো বেদনাদায়ক অধ্যায়ও রয়েছে। তাই ৭ নভেম্বরের মূল্যায়নে আবেগের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকার মূল্যায়নে তার মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদান বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ১৯৭১ সালে তিনি একজন সামরিক কর্মকর্তা ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা তার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। সামরিক পেশাদারত্ব, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে জিয়াউর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি বিপর্যস্ত রাষ্ট্রকে কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনা। তিনি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে গতিশীলতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল উন্নয়নকে শুধু সরকারি উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।

তার ১৯ দফা কর্মসূচি এই উন্নয়নদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, শিক্ষা সম্প্রসারণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার ছিল এ কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য। খাল খনন ও পুনঃখনন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি তার নীতির একটি ইতিবাচক দিক।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা বিকাশের সুযোগ সম্প্রসারণে মনোযোগী হন। শিল্প ও বাণিজ্যে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি করা ছিল তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ। বাংলাদেশের পরবর্তী শিল্পায়ন ও তৈরি পোশাক খাতের বিকাশে বহু সরকারের নীতি, উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের অবদান রয়েছে। তবে বেসরকারি উদ্যোগকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...