জলাশয় সংকটে খুলনা, ১৮ পুকুর সংস্কারে ২৭ কোটি টাকার প্রকল্প

তবে সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পুকুরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এই শিক্ষার্থী। তার ভাষ্য, এতে বেশি পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং পুকুরটি দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
ট্যাংক রোড পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের পানি স্বচ্ছ নয়। পানি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার শিখতে পারে। খুলনায় সাঁতার প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা সুইমিং পুল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুকুরগুলোতে সাঁতার শেখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা গেলে শিশুরা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি পুকুরগুলোর কিছু আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় পুকুর খনন ও পানি পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার, ঘাটলা এবং সৌন্দর্যবর্ধনমূলক বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুকুরগুলোর বর্তমান গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা কত এবং সংস্কারের পর তা কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেসিসির প্রকল্প পরিচালক আবির উল জব্বার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ১৮টি পুকুরের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সৌন্দর্যবর্ধন, খনন, পানি পরিবর্তন এবং প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার ও ঘাটলা নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বিলীন ৮০ জলাশয়, ঝুঁকিতে পরিবেশ
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি জলাশয়ের মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়েছে। আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ১৮টি পুকুর সংস্কার করা হলে নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে। পুকুরগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করতে পারে।
তিনি বলেন, খুলনা নগরে প্রতিবছর তাপমাত্রা বাড়ছে কিংবা অতিরিক্ত তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে। পুকুরগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
কংক্রিটের ব্যবহারে সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
তবে পুকুর সংস্কারের সময় পাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, পুকুরের পাড় ও আশপাশের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ, পুকুরে পানি সংরক্ষণ করে জলাবদ্ধতা কমানো ও তাপমাত্রার প্রভাব প্রশমনের যে সুফল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, চারপাশে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার করলে তা ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কংক্রিটের পরিবর্তে ছিদ্রযুক্ত বা পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে—এমন ব্যবস্থা না রাখলে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের কারণে তাপমাত্রা কমানোর সুফলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অধ্যাপক সালাউদ্দীনের মতে, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও নগরের জলাধার বা ‘ব্লু-স্কেপ’ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব স্থানে অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার এড়ানোর বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।
প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
কেসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও এসব পুকুরকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কেসিসির আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সরকারি পুকুর পুনঃসংস্কারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও কেসিসির এক প্রকল্প অবহিতকরণ সভায় নগরের পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে পুকুর খনন, গভীরতা বৃদ্ধি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা ব্যয় হবে এবং হাঁটার পথ, ঘাট, ধারণকারী দেয়াল ও শৌচাগারসহ সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে? ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা হলে পুকুর সংরক্ষণে প্রকল্পটির প্রকৃত অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট হবে।

