গোবরের বায়োগ্যাসে জ্বলছে ৩০ পরিবারের চুলা, সানজিদুলের বছরে আয় ১০ লাখ টাকা

শুধু গ্যাস উৎপাদনেই থেমে নেই এই উদ্যোগ। বায়োগ্যাস তৈরির পর অবশিষ্ট উপাদান ফেলে না দিয়ে তা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে জৈব সার। ফলে একই উদ্যোগ থেকে পাওয়া যাচ্ছে রান্নার জ্বালানি ও কৃষিকাজের উপযোগী সার। পাশাপাশি গরুর খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হচ্ছে পরিবেশবান্ধব উপায়ে।
২০১৮ সালে এসএসসি পাস করার পর ড্রাইভিং শেখার জন্য বগুড়ায় যান সানজিদুল ইসলাম। সেখানে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দেখে প্রথমবারের মতো তার মনে কৌতূহল তৈরি হয়। গরুর গোবর থেকেও যে রান্নার জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব, সেটিই তাকে ভাবতে শুরু করায়।

তখন থেকেই নিজের এলাকায় এমন একটি প্ল্যান্ট করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তবে জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন পর প্রবাসে পাড়ি জমান। প্রায় সাত বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে পুরোনো সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন তিনি।
মামার গরুর খামারের পাশেই প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করেন সানজিদুল। ২০২৬ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর প্রায় এক মাস আগে স্থানীয় ৩০টি পরিবারের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ও জৈব সার বিক্রি করে সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন এই উদ্যোক্তা।
সানজিদুলের প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যেও তৈরি হয়েছে স্বস্তি। তাদের ভাষ্য, সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে যেমন বাড়তি টাকা খরচ হয়, তেমনি অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে গ্যাস পাওয়া যায় না। কিন্তু পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত গ্যাস পাওয়ায় সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।
গ্রাহক রেহানা পারভিন বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস থেকে এটায় আমরা অনেকটাই সেফটি পাচ্ছি। কম টাকায় পাচ্ছি, বিশেষ করে সবসময় পাচ্ছি এবং এর তাপও বেশি। আমার হাসব্যান্ড বাইরে থাকে। সিলিন্ডার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে দোকানে নিতে হয়, আবার আনতে হয়। এতে অনেক ভোগান্তি হয়। এখন এসবের কোনো চিন্তা নেই, শুধু মাসে বিল দিই।
সানজিদুলের উদ্যোগ শুধু স্থানীয় পরিবারগুলোর রান্নার জ্বালানি সংকটই কিছুটা কমাচ্ছে না, আগ্রহ তৈরি করেছে অন্যদের মধ্যেও। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দেখতে এসে অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
জহির উদ্দিন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের এলাকার ছেলে গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদন করছে, তা আবার পাইপের মাধ্যমে মানুষের বাড়িতে দিয়ে অর্থ উপার্জন করছে বিষয়টি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তাই দেখতে এসেছি। আমারও ইচ্ছা আছে, ওর কাছ থেকে জেনে আমিও এরকম একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করব।
তিনি বলেন, সানজিদুলের এই উদ্যোগ এলাকার যুবসমাজের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে। এলাকার যুবকদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, বেকার না থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কিছু করার। কারণ ছোট থেকেই একসময় বড় কিছু করা সম্ভব।
বর্তমানে ৩০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলেও সানজিদুলের পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে প্ল্যান্টের পরিধি বাড়িয়ে অন্তত ১০০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
সানজিদুল ইসলাম বলেন, বগুড়ায় গিয়ে এমন একটি প্ল্যান্ট দেখে আমার ইচ্ছা হয়েছিল এলাকায় একটি প্লান্ট দেব। কিন্তু বিদেশ চলে যাওয়ায় আর করে ওঠা হয়নি। সাত বছর পর দেশে এসে সেই ইচ্ছা থেকেই ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্ল্যান্টটি স্থাপন করি। বর্তমানে এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস ৩০টি বাড়িতে সরবরাহ করছি। পাশাপাশি জৈব সারও তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটিকে আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন ৩০টি বাড়িতে লাইন দিয়েছি। যদি ১০০টি বাড়িতে লাইন দিতে পারি, তাহলে এলাকায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমবে।
তরুণদের উদ্দেশে সানজিদুল বলেন, প্রতিটি এলাকায় যদি এমন প্ল্যান্ট তৈরি করা যায়, তাহলে দেশের চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্জ্য থেকে সম্পদ, বদলাতে পারে গ্রামের অর্থনীতি গরুর গোবর সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় বর্জ্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু সানজিদুলের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সেই গোবরই হতে পারে রান্নার জ্বালানি ও কৃষির উপযোগী সার তৈরির কাঁচামাল। এতে একদিকে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের সুযোগ।

