ইন্টারনেটের ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটের নেপথ্য নায়ক ওন্দ্রেজ সুরি: পিএইচপির মহাবিপর্যয় ঠেকালেন একাই

আধুনিক ইন্টারনেটের ভিত্তি যে কতটা ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা নতুন করে সামনে এলো পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার এক সংকটে। বিশ্বের সিংহভাগ ওয়েবসাইট পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এই ব্যবস্থার ঝুঁকি দূর করে ডিজিটাল দুনিয়াকে এক মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ওন্দ্রেজ সুরি নামের এক স্বেচ্ছাসেবী। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি নিঃস্বার্থভাবে পিএইচপির উন্নয়ন ও এর প্যাকেজ বিতরণের কাজটি একাই সামলে আসছেন।
পেশাগত পরিচয়ে ওন্দ্রেজ সুরি ‘ইন্টারনেট সিস্টেমস কনসোর্টিয়াম’-এর ডোমেইন নেম সিস্টেম (ডিএনএস) ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক। তবে এর বাইরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই গত ২০ বছর ধরে তিনি পিএইচপি প্যাকেজ তদারকির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ডিজিটাল বিশ্বের বড় একটি অংশ যখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, তখন তার এই অবিচল দায়িত্বশীলতা রক্ষা করেছে ইন্টারনেটকে। বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রেডিটে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিবিদদের প্রশংসায় ভাসছেন তিনি।
সুরির অবদান এবং ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরে উন্মুক্ত সফটওয়্যার ডেভেলপার ইয়ান ল্যান্ডসম্যান এক বার্তায় লিখেছেন, ইন্টারনেটের অধিকাংশ পিএইচপি প্যাকেজ বিতরণের দায়িত্ব এই একজন মানুষের ওপরই নির্ভর করছে। যদি তার কিছু হয়ে যেত, তবে পুরো বিশ্বই বিপদে পড়ত। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওন্দ্রেজ সুরি নিজেও এই ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন এবং উন্মুক্ত সফটওয়্যার খাতের চরম বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন।
ইন্টারনেট ব্যবস্থায় পিএইচপির গুরুত্ব কতটা গভীর
বিশ্বের মোট ওয়েবসাইটের ব্যাকএন্ড বা সার্ভার পরিচালনার প্রায় ৭০ শতাংশই চলে হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর বা পিএইচপি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। গোটা ইন্টারনেটের ৪০ শতাংশেরও বেশি ওয়েবসাইট পরিচালনা করে সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা সিএমএস ‘ওয়ার্ডপ্রেস’, যার পুরো কাঠামোটিই পিএইচপির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম জুমলা ও ড্রুপালও সম্পূর্ণভাবে পিএইচপি দিয়ে পরিচালিত হয়।
১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু করা ৩০ বছরের পুরোনো এই প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ প্রায় সব ওয়েব হোস্টিং প্রোভাইডারের সিস্টেমে আগে থেকেই সমর্থন পায়। ফলে এটি ইনস্টল ও রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত সহজসাধ্য। প্রযুক্তিটি সম্পূর্ণ ওপেন-সোর্স বা উন্মুক্ত হওয়ায় এতে কোনো ধরনের লাইসেন্স ফি লাগে না। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকায় সারা বিশ্বে এর বিশাল ডেভেলপার নেটওয়ার্কও তৈরি হয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এগিয়েছে পিএইচপি। এর ৮ বা তার পরবর্তী সংস্করণগুলোতে ‘জেআইটি কম্পাইলার’ যুক্ত করার ফলে কার্যক্ষমতা ও গতি আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া লারাভেল ও সিমফনির মতো আধুনিক শক্তিশালী ফ্রেমওয়ার্কগুলোর কল্যাণে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বা এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ের সফটওয়্যার তৈরিতেও ভাষাটির ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্বের লাখ লাখ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, সরকারি দপ্তর ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মূল মেরুদণ্ড এই পিএইচপি। ফলে এই ব্যবস্থায় সামান্য কোনো বড় ত্রুটি বা বিপর্যয় তৈরি হলে গোটা বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়বে।

