রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড: তিন কারণে ফল বিপর্যয়আজকের নামাজের সময়সূচি: ০১ নভেম্বর ২০২৬সাজেকে আবারও অবরোধ ঘোষণালংমার্চে সীমিত অংশগ্রহণ: জোটে থেকেও এনসিপির নিজের রাজনীতিতে জোরকল্যাণপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মশাল মিছিলসন্ধ্যার পর অকারণে বাইরে ঘুরলে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি ডিআইজিরতফসিলের আগেই নেহালপুরে ভোটের হাওয়া: পাড়া-মহল্লা ছাপিয়ে ফেসবুকে সরব সম্ভাব্য প্রার্থীরাসাত দফা মেনে নিলে, এক দফার প্রয়োজন হবে না: সমাপনী বক্তব্যে জামায়াত আমিরযশোরে অস্ট্রেলীয় নাগরিকের ব্যাগ ছিনতাইচেষ্টার অভিযোগে যুবক আটকনেহালপুর ইউপি নির্বাচন: তফসিলের আগেই মাঠ ও ফেসবুকে সরব প্রার্থীরা
বিজ্ঞাপন

ভেঙে পড়েছে কিউবা, স্মৃতি হয়েছে বিপ্লব, পুনরুত্থান ঘটেছে গির্জার

নিজস্ব প্রতিবেদক২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ভেঙে পড়েছে কিউবা, স্মৃতি হয়েছে বিপ্লব, পুনরুত্থান ঘটেছে গির্জার

দুরবস্থায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসক সংকটে গ্রামাঞ্চল

কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করা হয়েছে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। ফিদেল কাস্ত্রো স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতেন। একসময় বিদেশে চিকিৎসক পাঠিয়েও দেশটির সরকার আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও বৈদেশিক আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে বিদেশে পাঠানো চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ ও স্বাধীনতা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

বর্তমানে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটে বিপর্যস্ত। বহু চিকিৎসক দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কমেছে।

সান্তিয়াগো দে কিউবার উপকূলের কাছে কায়ো গ্রানমা দ্বীপে ৫৫ বছর বয়সী নার্স ক্লারা লুয়াসেসের সঙ্গে দেখা করেন প্রতিবেদক। সেখানে প্রায় ৮৭০ জন বাসিন্দার পাশাপাশি আশপাশের উপকূলীয় এলাকার বহু মানুষের চিকিৎসার দায়িত্বও তাঁকে সামলাতে হয়। চিকিৎসকদের দ্রুত দেশত্যাগের কারণে রোগীর সংখ্যা ও দায়িত্বের পরিধি নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাঁর চিকিৎসাকেন্দ্রটি ছিল ছোট একটি কক্ষ। সেখানে জ্বরে আক্রান্ত ১২ বছরের এক শিশুর হাতে স্যালাইনের নল লাগানো ছিল। পাশেই ত্বকের সংক্রমণে আক্রান্ত এক শিশু মায়ের সঙ্গে বসে ছিল।

লুয়াসেস জানান, প্রায় তিন মাস ধরে দ্বীপটিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বর ও ত্বকের সংক্রমণ বেড়েছে। ওষুধের সংকটও নিয়মিত সমস্যা। সীমিত সম্পদ নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে তাঁকে প্রায় অসম্ভব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, অবসরে যাওয়ার সুযোগও তাঁর নেই, কারণ দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই।

দারিদ্র্য, ভিক্ষাবৃত্তি ও ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ

দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সান্তিয়াগো দে কিউবায় ভিক্ষুকের সংখ্যা দেখে বিস্মিত হয়েছেন প্রতিবেদক। সমুদ্রতীরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় ৭৬ বছর বয়সী এক নারী ও তাঁর মেয়ের। দুজনই ছিলেন অত্যন্ত শীর্ণকায়। ওই নারী জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে গত বছর তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে। ছেলেই ছিলেন তাঁদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

এরপর থেকে মা-মেয়ে রাস্তায় ভিক্ষা করছেন এবং প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রির মাধ্যমে সামান্য অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। তাঁদের কোনো সরকারি সহায়তা নেই। তাঁদের বাসায় গিয়ে প্রতিবেদক দেখেন, মেঝেতে থাকা ছোট একটি কক্ষে ধাতব খাটের ওপর বিছানার বদলে কার্ডবোর্ড বিছিয়ে তাঁরা ঘুমান। ঘরে বিদ্যুতের বাল্বও নেই।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। একসময় কিউবায় কমিউনিস্ট সরকারের পক্ষে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির কাজে বিপ্লব রক্ষার কমিটিগুলো সক্রিয় ছিল। কিন্তু প্রতিবেদক স্থানীয় মানুষের কাছে এসব কমিটির কথা জানতে চাইলে অনেকে হাসাহাসি করেন। সরকারের সমালোচনা করতেও তাঁদের আগের তুলনায় কম ভয় পেতে দেখা গেছে।

বারাকোয়া সমুদ্রসৈকতে এক ব্যক্তির বক্তব্যে সেই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। কমিউনিজম নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে তীব্র গালিগালাজ করেন। প্রথমে অন্যরা হাসলেও পরে ওই ব্যক্তি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, কিউবা যেন সময়ের মধ্যে আটকে গেছে। মানুষের কোনো আশা নেই; কিউবান হিসেবে জন্ম নেওয়াই তাঁর কাছে দুঃখজনক।

প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা অনেকেই নিজেদের দুরবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেননি। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহে মার্কিন বাধার চেয়ে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব বেশি ছিল। মহামারিতে কিউবার পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থের মূল্য ও প্রাপ্যতা কমে যায়।

একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী জানান, ভেনেজুয়েলার তেল সাধারণ মানুষের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাত না।

পূর্ব কিউবার বারাকোয়াতে একটি গির্জায় যাজক ও সচিব। ছবি: দ্য আটলান্টিক
পূর্ব কিউবার বারাকোয়াতে একটি গির্জায় যাজক ও সচিব। ছবি: দ্য আটলান্টিক

রাষ্ট্রের জায়গা নিচ্ছে গির্জা

রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি পূরণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বাড়ছে। কিউবায় একসময় ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব ছিল ব্যাপক। বিপ্লবের পর সরকার নাস্তিকতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অনেকে দেশত্যাগে বাধ্য হন। বিশ্বাসীদের কেউ কেউ পুনর্শিক্ষা শিবিরেও পাঠানো হয়।

কিন্তু বর্তমানে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে ক্যাথলিক গির্জার পাশাপাশি ইভানজেলিক্যাল ও পেন্টেকোস্টাল গির্জার প্রসার ঘটছে। বারাকোয়া অঞ্চলে গত তিন দশকে অ্যাসেম্বলি অব গডস সম্প্রদায়ের গির্জার সংখ্যা দুটি থেকে বেড়ে ৪০ টিতে পৌঁছেছে বলে এক ধর্মযাজক জানিয়েছেন।

বারাকোয়ার পেন্টেকোস্টাল যাজক রাউল দে হেসুস মুনিওস মুন্ডার জানান, তাঁর মণ্ডলীতে নিয়মিত প্রায় ১ হাজার ১০০ জন সদস্য রয়েছেন। তবে সহায়তা পান আরও অনেক মানুষ। প্রতি সপ্তাহে সহযোগী যাজকদের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি বিভিন্ন এলাকার অসুস্থ, খাদ্যসংকটে থাকা এবং ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে—এমন মানুষের খবর নেন। এরপর তাঁদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

গত মে মাসে কিউবার জন্য ১০ কোটি ডলারের সহায়তা অনুমোদনের সময় ট্রাম্প প্রশাসন শর্ত দিয়েছিল, অর্থ বিতরণ করতে হবে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ও মানবিক সংস্থার মাধ্যমে। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক ভূমিকা আরও বেড়েছে। তবে কিউবায় ধর্মীয় পুনর্জাগরণ শুধু বিদেশি সহায়তার ফল নয়; রাষ্ট্রীয় সেবার অবনতিও এর অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে, রাজধানী হাভানার একটি ক্যাথলিক বৃদ্ধাশ্রমে দেখা গেছে, একসময় সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তিরাও এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অনেকের সন্তান বিদেশে চলে গেছেন। রাষ্ট্র ও পরিবার—দুই দিক থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

একজন ৬৫ বছর বয়সী সাবেক সেনাসদস্য অ্যাঙ্গোলায় দুই বছর যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর বাহুতে ছিল চে গুয়েভারার উলকি, যা তিনি ১৮ বছর বয়সে করিয়েছিলেন। একসময় বিপ্লবের সমর্থক ওই ব্যক্তি এখন দেশের পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

সান্তিয়াগো শহরের সান্তা ইফিজেনিয়া সমাধিক্ষেত্রে ফিদেল কাস্ত্রোর দেহাবশেষ সমাহিত করা হয়। ছবি: দ্য আটলান্টিক
সান্তিয়াগো শহরের সান্তা ইফিজেনিয়া সমাধিক্ষেত্রে ফিদেল কাস্ত্রোর দেহাবশেষ সমাহিত করা হয়। ছবি: দ্য আটলান্টিক

বিপ্লবের স্মৃতি আছে, নেই আগের প্রাণচাঞ্চল্য

কিউবার বর্তমান সংকটের আরেকটি দিক হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবক্ষয়। সান্তিয়াগো শহরের ৮১ বছর বয়সী এক সংগীতশিল্পী জানান, একসময় শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে সংগীতের দল দেখা যেত। ৪৫ বছর ধরে গানের সঙ্গে যুক্ত থেকেও এখন তিনি সেই দৃশ্য আর দেখেন না।

প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা অনেকেই বলেছেন, কিউবা আগে এমন ছিল না। তাঁদের বক্তব্যে শুধু খাদ্যসংকট, অসুস্থতা ও বিদ্যুৎবিভ্রাটের কথাই উঠে আসেনি; এসেছে মানুষের ক্ষোভ, হতাশা এবং জনজীবন থেকে আনন্দ ও প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে যাওয়ার কথাও।

দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনটির শেষাংশে উঠে এসেছে সান্তিয়াগো শহরের সান্তা ইফিজেনিয়া সমাধিক্ষেত্রের চিত্র। সেখানে ফিদেল কাস্ত্রোর দেহভস্ম সংরক্ষিত রয়েছে। পুরো দেশজুড়ে অবহেলা ও ভাঙাচোরা পরিবেশের বিপরীতে সমাধিক্ষেত্রটি ছিল পরিচ্ছন্ন, সবুজ এবং সুপরিচর্যিত। সেখানে নিয়মিত সামরিক কায়দায় প্রহরী বদল করা হয়। কিউবার জাতীয় বীর হোসে মার্তির সমাধিসৌধের সামনে সেনাসদস্যদের আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজও চলে।

সুশৃঙ্খল সেই আয়োজন দেখে মুহূর্তের জন্য মনে হতে পারে, বিপ্লবের স্বপ্ন এখনো অটুট। কিন্তু সমাধিক্ষেত্রের বাইরে বাতাসে ভেসে আসে পোড়া আবর্জনার তীব্র গন্ধ। সেই গন্ধই যেন কিউবার বর্তমান বাস্তবতার প্রতীক—একদিকে বিপ্লবের স্মৃতি ও রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষুধা, অসুস্থতা, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান হতাশা।

আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...