চীনে এখন শিশুর চেয়ে প্রবীণ বেশি, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার বার্ধক্য চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবারগুলোর ব্যয়, পেনশনব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগের ওপর। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে উৎপাদন ও শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণ মানুষের পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। ফলে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিয়েটেল-বাস্টেন বলেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ হতে পারে, সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয়ের বদলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে চলে যাবে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক মু ঝেং মনে করেন, জনসংখ্যার এই প্রবণতা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
জনসংখ্যার এই সংকট মোকাবিলায় চীন কয়েক বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার তরুণ প্রজন্মকে বিয়ে করতে এবং দম্পতিদের আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে। তবে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সেই উদ্যোগে খুব বেশি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করলেও এখন চীনকে উল্টো বেশি সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে হচ্ছে।
দেশটির জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও বার্ধক্য বাড়ার পেছনে দ্রুত নগরায়ণ এবং বিতর্কিত এক সন্তান নীতির প্রভাব রয়েছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকা ওই নীতির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। চীনের সরকারের অনুমান, এই নীতির ফলে প্রায় ৪০ কোটি শিশুর জন্ম ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল। তবে এ হিসাবের যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
মু ঝেংয়ের মতে, জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার পেছনে এক সন্তান নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে পরিবারে প্রবীণ আত্মীয়দের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো তরুণ মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। একই সঙ্গে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার হার বাড়ার মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ, শুধু সরকারি নীতি শিথিল করলেই জন্মহার বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনযাপন, আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতা।
জনসংখ্যার বার্ধক্য মোকাবিলায় সরকারি সহায়তাও বাড়াচ্ছে বেইজিং। চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রবীণদের জন্য বাড়তি সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবীণ নাগরিক বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন। প্রবীণদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এই খাতে সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

