পদত্যাগের বিষয়ে ফেসবুক পোস্টে যা বললেন সামান্তা শারমিন

তৃতীয় প্রসঙ্গ:
অভ্যুত্থানে নারীর মালিকানা এবং অধিকার
আধুনিক রাজনীতির ইতিহাসে নারীরা যেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, সেই আন্দোলন পরাজিত হয়নি। বাংলাদেশের লড়াইয়ের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নারীরা ছিলেন এই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা।
নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান—এসবই ছিল এই অভ্যুত্থানে তাঁদের অংশগ্রহণের ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাঁদের অবস্থান, সাহস ও সক্রিয়তা অভ্যুত্থানকে সার্বজনীন রূপ দিয়েছে।
কিন্তু বিজয়ের পর থেকেই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক পক্ষগুলো, দলগুলো নারীদের সেই বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে। আন্দোলনের সময় যেসব সামাজিক অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় নাই, যেসব প্রতিবন্ধকতা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে থামাতে পারে নাই, বিজয়ের পর সেগুলোকেই নারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবেই নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য হিস্যার দাবিকে কোণঠাসা করে পুরোনো, নারীবিহীন রাজনৈতিক মাঠ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে।
পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। দলটি চাইলে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত। সে জন্য শুধু নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট না; সংখ্যা, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথ বেছে নেয়নি বরং দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের অবনমন ঘটেছে।
এনসিপি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের এগিয়ে আসার যে সম্ভাবনা গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিল, তা ধারণ করতে চায়নি। বরং পুরোনো দলগুলোর মতোই নারীদের কোণঠাসা করেছে, তাঁদের প্রতিবাদকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ নারীরা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ। এনসিপি মনে করেনি নারীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে শুধু দলের নারী সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা নয়; দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।
বাংলাদেশের মতো সমাজে নারীদের উত্তরণের জন্য ইতিবাচক বৈষম্য বা পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন দরকার—অর্থাৎ ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে নিতে বিশেষ সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। কারণ, রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো নারীদের দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। এই ব্যবধান কাটাতে নারীদের শুধু সমান সুযোগ দিলেই চলে না; প্রয়োজন অধিক প্রতিনিধিত্ব, অধিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ। এত কিছুর পরও হয়তো প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যের পুরো ব্যবধান দূর করা সম্ভব হতো না।
নারীদের রাজনৈতিকভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণশীল অবস্থানের অনুসারী ও সহযোগী হয়েছে। ফলে সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যেও নারীবিরোধী অবস্থান জায়গা করে নিয়েছে।
আন্দোলনে নারী যে ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে পুরুষও তা রাখতে পারেন না। পুরুষ যখন অন্য পুরুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড়ান, তার প্রভাব এক রকম; কিন্তু নারী যখন পুরুষের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন, তখন সেই ভূমিকা প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতাসম্পর্ক ও সামাজিক প্রত্যাশাকে আরও গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সুরক্ষিত করেছেন। অথচ বিজয়ের পর তাঁদের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: আন্দোলনের সময় মিছিলের সামনে নারীদের এগিয়ে রাখা কি তাঁদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি ছিল, নাকি বিপদের মুখে তাঁদের উপস্থিতিকে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল ছিল? যদি নারীদের সাহস ও ত্যাগ আন্দোলনের প্রয়োজনে গ্রহণ করা হয়, অথচ বিজয়ের পর তাঁদের ক্ষমতা ও ন্যায্য হিস্যা অস্বীকার করা হয়, তাহলে তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়?
যে অভ্যুত্থান বৈষম্য, নিপীড়ন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তার উত্তরাধিকার বহন করার দাবি করা একটি দল নিজের কাঠামোর ভেতরেই বৈষম্যমূলক ক্ষমতাসম্পর্ক পুনরুৎপাদন করতে পারে না। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণ করেননি; তাঁরা আন্দোলনের চরিত্র নির্মাণ করেছেন। যে রাজনৈতিক শক্তি বিজয়ের জন্য নারীর সাহস ও প্রতিরোধকে প্রয়োজনীয় মনে করে, অথচ বিজয়ের পর তাঁদের সমান মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে অস্বীকার করে, সে শক্তি প্রকৃত অর্থে বৈষম্যবিরোধী নয়।

