সুরা মুলক পড়ার গুরুত্ব

সুরাটির শেষাংশে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষের অসহায়ত্ব ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এসব শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়, তাঁর আনুগত্য এবং আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
ক্ষমা লাভের সুপারিশ করবে সুরা মুলক
সুরা মুলকের অন্যতম ফজিলত হলো, এটি তার আমলকারীর জন্য সুপারিশ করবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরআনের ৩০ আয়াতবিশিষ্ট একটি সুরা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সুরাটি হলো ‘তাবারাকাল্লাযি বিইয়াদিহিল মুলক’, অর্থাৎ সুরা মুলক।
(জামে তিরমিজি: ২৮৯১, সুনানে আবু দাউদ: ১৪০০, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৭৮৬ ও মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৭৫)
মুসতাদরাকে হাকেমের ৩৮৩৮ নম্বর হাদিসে এসেছে, ৩০ আয়াতবিশিষ্ট এই সুরা একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছে।
এসব বর্ণনা থেকে সুরা মুলকের মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাই একজন মুমিনের উচিত নিয়মিত এ সুরা তিলাওয়াত করা এবং এর শিক্ষাকে নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করা।
কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার ফজিলত
কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের ২৮৬৭ নম্বর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।’
সুরা মুলকের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় সুরা মুলককে ‘আল-মানিআহ’ বা বাধা প্রদানকারী বলা হয়েছে। সেখানে এ সুরার আমলকারীর কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে। (মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৮৩৯; শুআবুল ইমান: ২২৭৯)
এ ধরনের বর্ণনা মুমিনকে সুরা মুলকের নিয়মিত তিলাওয়াতে উৎসাহিত করে। তবে তিলাওয়াতের পাশাপাশি আল্লাহর আনুগত্য, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করাও জরুরি।
রাতে সুরা মুলক তিলাওয়াতের গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল থেকে রাতে সুরা মুলক তিলাওয়াতের গুরুত্ব বোঝা যায়। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) সুরা সাজদাহ ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে ঘুমাতে যেতেন না। (জামে তিরমিজি: ৩৪০৪; মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৫৪৫; মুসনাদে আহমাদ: ১৪৬৫৯)
এই বর্ণনার আলোকে রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কেউ চাইলে ইশার নামাজের পরও এ সুরা পড়তে পারেন। তবে তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সময়কে বাধ্যতামূলক মনে না করে নিয়মিত আমল বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
যাদের সুরাটি মুখস্থ নেই, তারা কোরআন দেখে তিলাওয়াত করতে পারেন। ধীরে ধীরে মুখস্থ করার চেষ্টা করার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদ পড়ে এর অর্থ বোঝার অভ্যাসও গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে তিলাওয়াতের সঙ্গে সুরাটির শিক্ষা অনুধাবনের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবারকেও শেখানোর চেষ্টা
সুরা মুলকের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত আলোচনায় নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও এ সুরা শেখানোর প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাই ঘরে কোরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ তৈরি করা, সন্তানদের ছোটবেলা থেকে কোরআনের সঙ্গে পরিচিত করা এবং নিয়মিত তিলাওয়াতে উৎসাহ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সবাই মিলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সুরা মুলক তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথমে শুদ্ধভাবে পড়া শেখানো, পরে আয়াতের সহজ অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা ও পরকালের জবাবদিহি সম্পর্কে সচেতনতাও তৈরি হবে।
তিলাওয়াতের পাশাপাশি অর্থ বোঝা জরুরি
সুরা মুলকের আয়াতগুলো মানুষকে বারবার আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে, জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে এবং আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানায়। মানুষ যেন নিজের শক্তি, সম্পদ ও ক্ষমতাকে চূড়ান্ত মনে না করে; বরং সবকিছুর প্রকৃত মালিক যে আল্লাহ, তা স্মরণ রাখে—এই শিক্ষা সুরাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

