৫০ বছর ধরে বাদাম বিক্রেতা নিখিল, শেষ বয়সেও নেই স্থায়ী ঠিকানা

নিখিল হালদার বলেন, মাত্র ২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বাদামের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে ১২০ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন একটি কড়াই। শুরুর দিকে হাটের দিনে ২০০ থেকে ৪০০ টাকার বাদাম বিক্রি হতো। বর্তমানে মঙ্গলবার ও শুক্রবার দরগা-মাজারের হাটে তিন থেকে চার হাজার টাকার বাদাম বিক্রি করেন। অন্য দিনগুলোতে বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো। তবে এই টাকা পুরোটাই তার লাভ নয়। বাদাম কেনাসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে তা দিয়েই চলে সংসার।
তিনি বলেন, ছোটবেলায় পেটের দায়ে বাদাম বিক্রি শুরু করেছিলাম। তখন বাবা-মা অসহায় ছিলেন, লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। প্রথমে ২০০ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাদাম বিক্রি করেই বেঁচে আছি। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু সেই কষ্টের যেন শেষ নেই।

নিখিল হালদারের সংসারে স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছেন। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে শিমুল ও পলাশ এখনো বেকার। সন্তানদের বড় করা, মেয়ের বিয়ে দেওয়া এবং পরিবারের ভরণপোষণ সবকিছু সামলাতে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন তিনি। পরিবারের জন্য সবকিছু করতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবার সুযোগ হয়নি। আজ বার্ধক্যে এসে সেই বাদাম বিক্রিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
তিনি আরও বলেন, ঝড়-বৃষ্টি হলেও আমার ছুটি নেই। পরিবারের জন্য আমাকে বাদাম বিক্রি করতেই হবে। এই ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের বড় করেছি, মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকলে হাত-পা ব্যথা করে। তবুও সংসারের জন্য কষ্ট করতেই হচ্ছে। এখন আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। কোনো অর্থ-সম্পদেরও প্রয়োজন নেই। এভাবেই যত দিন বেঁচে থাকা যায়, সেটাই ভালো।
বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শারীরিক কষ্ট, অন্যদিকে বেড়েছে ব্যবসার খরচও। বর্তমানে তেল বাদামের কেজি কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। ফলে আগের তুলনায় লাভ কমে গেছে। দিনভর পরিশ্রম করেও সংসারের সব চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নিজের নামে নেই কোনো জমি বা বাড়ি। অন্যের জায়গায় বসবাস করেই কাটছে তার জীবন। নিজের জন্য কিছু করতে পারিনি, কোনো সম্পদও গড়তে পারিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় বলেন, আমি দাদুর কাছ থেকে বাদাম খেয়ে যাই। তার বানানো বাদাম খুব ভালো লাগে। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে দূর থেকে এসে তার বাদাম খাই। স্বাদটা আমার কাছে বেশ ভালো লাগে।
মেহেদী হাসান বলেন, আমার বাড়ি পাশের এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই এই মাজারে চলাফেরা, এখানেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই নিখিল কাকাকে এখানে বাদাম বিক্রি করতে দেখছি। তার বাদাম খুব ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকে খাচ্ছি, এখনো খাই। পরিচিত কেউ এলে তাকেও বলি, নিখিল কাকার হাতের বানানো বাদাম খুবই সুস্বাদু।
স্থানীয় দোকানি মুন্না শেখ বলেন, নিখিল কাকা দীর্ঘদিন ধরে দরগার মোড়ে বাদাম বিক্রি করেন। আমরা প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে আড্ডা দিতে যাই। আগে তার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই, তারপর অন্য কাজে যাই। ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে আসছি। তার বাদাম খুবই সুস্বাদু, এ জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। কিছুদিন আগে বরিশালের স্বরূপকাঠি থেকে কয়েকজন এসে তার খোঁজ করছিলেন। তারা নিখিল কাকাকে চিনতেন এবং তার বাদাম খেতে চেয়েছিলেন। পরে আমি তাদের দেখিয়ে দিয়েছি কোথায় তিনি বসেন।
ক্রেতা সজীব বলেন, এক ভাইয়ের সঙ্গে দরগায় ঘুরতে এসে তার কাছ থেকে বাদাম খেয়েছিলাম। খেয়ে খুব মজা পেয়েছি। এরপর মাঝেমধ্যে এখানে ঘুরতে এলে তার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই। অনেক দিন ধরে তাকে এখানে বাদাম বিক্রি করতে দেখছি। তার বাদামের স্বাদ সত্যিই ভালো।
মামুন বলেন, আমি সৌদি আরবে ১০ বছর ছিলাম, তিন বছর আগে দেশে ফিরেছি। দেশে ফিরে এখনো দেখি কাকা বাদাম বিক্রি করছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ আর তার বাদামও খুব ভালো।
দীর্ঘ ৫০ বছরের পরিশ্রমের কথা বলতে গিয়ে নিখিল হালদারের কণ্ঠে ফুটে ওঠে আক্ষেপ। জীবনের সিংহভাগ সময় পরিবারের জন্য ব্যয় করলেও নিজের জন্য কিছুই করতে পারেননি বলে মনে করেন তিনি। তার কাছে এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই, নেই অর্থ-সম্পদ গড়ার প্রত্যাশাও।

