উপন্যাস হতে গিয়ে ধারাবাহিক হয়ে গেল ‘দার-ই-নিজাত’

পাকিস্তানি লেখিকা উমেরা আহমেদের লেখা ধারাবাহিক ‘দার-ই-নিজাত’ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। শেহরিয়ার মুনাওয়ার, দুরেফিশান সেলিম ও নামির নাওয়াজ খানের অভিনয়ে নির্মিত ধারাবাহিকটি গল্পের পাশাপাশি এর বিষয়বস্তু নিয়েও আলোচনায় রয়েছে। তবে এবার নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে এর জন্মকাহিনি নিয়ে। কারণ, টেলিভিশনে দর্শকদের সামনে আসা এই গল্পটি একসময় উপন্যাস হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলেন লেখিকা।
সম্প্রতি পুরোনো একটি সাহিত্য সাময়িকীতে উমেরা আহমেদের লেখা একটি মন্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেখান থেকেই জানা যায়, ‘দার-ই-নিজাত’ মূলত তার পরবর্তী উপন্যাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইয়ের পাতায় জায়গা না পেয়ে গল্পটি রূপ নেয় টেলিভিশন ধারাবাহিকে।
‘আকস’-এর সঙ্গে জড়িয়ে গল্পের শুরু
২০১১ সালে নিজের উপন্যাস ‘আকস’ লেখার সময়ই ‘দার-ই-নিজাত’-এর ভাবনা তৈরি হয়েছিল উমেরা আহমেদের মনে। সে সময় একই সঙ্গে দুটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। একটি ‘আকস’, অন্যটি ‘দার-ই-নিজাত’।
পরিকল্পনা ছিল, ‘আকস’ প্রকাশের পরই পাঠকদের হাতে তুলে দেবেন নতুন উপন্যাসটি। কিন্তু গল্প দুটির চরিত্র ও বিষয়বস্তুর জটিলতা বিবেচনা করে প্রথমে ‘আকস’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন লেখিকা। তাঁর ধারণা ছিল, ‘দার-ই-নিজাত’ তুলনামূলকভাবে আরও জটিল গল্প এবং এর চরিত্রগুলোও পাঠকের কাছে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করবে।
নিজের সেই পরিকল্পনা বোঝাতে ‘আকস’-কে ক্ষুধা বাড়ানোর জন্য পরিবেশিত খাবারের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন উমেরা আহমেদ। আর ‘দার-ই-নিজাত’কে বলেছিলেন সাত পদের ভোজের মতো। অর্থাৎ, ‘আকস’ ছিল পরবর্তী বড় গল্পের আগে ছোট্ট প্রস্তুতি।
উপন্যাসের পরিকল্পনা থেকে টেলিভিশনের চিত্রনাট্য
তবে শেষ পর্যন্ত উমেরা আহমেদের সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে গল্পটিকে নতুনভাবে সাজিয়ে টেলিভিশন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্যে রূপ দেন তিনি। ফলে যে গল্প একসময় বইয়ের মলাটে প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল, সেটিই এখন টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকদের আলোচনার বিষয়।
ধারাবাহিকটির গল্পে প্রেম, সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি উঠে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, আত্মিক পরিশুদ্ধি, অনুশোচনা এবং নৈতিকতার মতো বিষয়। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশীলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বাসের চর্চা নিয়ে গল্পে নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছেন লেখিকা।
এ কারণে প্রচলিত প্রেম কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্বের গল্পের বাইরে গিয়ে দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে ‘দার-ই-নিজাত’। গল্পের কয়েকটি বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
অভিনয়ে শেহরিয়ার, দুরেফিশান ও নামির
২০২৬ সালের ১ আগস্ট পাকিস্তানের এআরওয়াই ডিজিটাল চ্যানেলে প্রচার শুরু হয় ‘দার-ই-নিজাত’-এর। এটি পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। এতে আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করছেন শেহরিয়ার মুনাওয়ার। জারিয়াব চরিত্রে রয়েছেন দুরেফিশান সেলিম এবং জামিলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নামির নাওয়াজ খান।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন চরিত্রে দেখা যাচ্ছে সাহার হাশমি, রোমাইসা খান, সানিয়া সাঈদ ও সাবা হামিদসহ আরও কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকে। শেহরিয়ার মুনাওয়ার ও সোনিয়া খানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থ্রি'স এন্টারটেইনমেন্টের টেলিভিশন প্রযোজনায় অভিষেকও হয়েছে এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে।
আবু বকর চরিত্র নিয়েও নতুন আলোচনা
ধারাবাহিকটির জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় এসেছে শেহরিয়ার মুনাওয়ার অভিনীত আবু বকর চরিত্রটিও। সম্প্রতি বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে চরিত্রটির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন অভিনেতা।
দর্শকদের কাছে আবু বকরকে অনেকটাই আদর্শ একজন মানুষ হিসেবে মনে হলেও শেহরিয়ারের ব্যাখ্যায় চরিত্রটির কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। বিশেষ করে অন্যদের খুশি রাখতে গিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারার প্রবণতা রয়েছে তার মধ্যে। পাশাপাশি জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের দীর্ঘদিনের অনুভূতির বিষয়টিও তুলে ধরেছেন অভিনেতা।
শেহরিয়ারের মতে, আবু বকরের ভালো লাগা শুধু কথায় প্রকাশ পায় না; বরং জারিয়াবের ছোটখাটো পছন্দ মনে রাখা কিংবা তার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার মধ্যেও সেই অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে। সব মিলিয়ে উপন্যাস হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা থেকে টেলিভিশন ধারাবাহিক হয়ে ওঠা ‘দার-ই-নিজাত’ এখন দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। উমেরা আহমেদের বহু বছর আগের একটি সাহিত্যিক ভাবনা যে শেষ পর্যন্ত ভিন্ন মাধ্যমে এসে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে, সেটিই যেন এই ধারাবাহিকের পেছনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প।

