নারীদের অনিয়মিত মাসিক ও ওজন বৃদ্ধির পেছনে পিসিওএস নয় তো? জেনে নিন লক্ষণ ও কারণ

অনেক নারীই হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, মুখে অবাঞ্ছিত লোম বা দীর্ঘ ব্যবধানে মাসিকের সমস্যায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই হরমোনজনিত জটিলতার অন্যতম বড় কারণ পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা সংক্ষেপে পিসিওএস। বর্তমান সময়ে প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে বিপাক ও হরমোন সম্পর্কিত এই সংকট বেশ সাধারণ রূপ নিয়েছে।
পিসিওএসে আক্রান্ত হলে ডিম্বাশয় থেকে সময়মতো ডিম্বাণু বের হতে পারে না, যার প্রভাবে মাসিকের ছন্দ বিঘ্নিত হয় এবং সন্তান ধারণে জটিলতা দেখা দেয়। তবে এ সমস্যা দেখা দেওয়া মানেই মা হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিয়মিত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুস্থ থাকা এবং গর্ভধারণ সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রোগটির সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। তবে শরীরে ইনসুলিনের অস্বাভাবিক কার্যকারিতা, পুরুষ হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেনের আধিক্য এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের যোগসূত্র রয়েছে এর নেপথ্যে। সময়মতো রোগটি ধরা পড়লে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে আনা যায়।
পিসিওএস আসলে কী?
ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ও শারীরিক বিপাক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে পিসিওএস। সুস্থ দেহে প্রতি মাসে ডিম্বাশয়ে একটি করে পরিপক্ব ডিম্বাণু তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসে, যা ‘ওভুলেশন’ নামে পরিচিত। হরমোনের তারতম্যের কারণে এই স্বাভাবিক ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ডিম্বাশয়ে তরলভর্তি ছোট ছোট কিছু থলি বা ফলিকল জমতে দেখা যায়। অনেকে এগুলোকে সিস্ট ভেবে ভুল করেন। চিকিৎসকদের মতে, ডিম্বাশয়ে সিস্ট না থাকলেও কারও পিসিওএস হতে পারে, আবার আলট্রাসনোগ্রামে ফলিকল দৃশ্যমান হলেই যে রোগী নিশ্চিতভাবে পিসিওএসে আক্রান্ত, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও সঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, প্রজনন বয়সে পা দেওয়া নারীদের প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পিসিওএসে আক্রান্ত, যদিও তাদের বড় একটি অংশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।
রোগের সাধারণ লক্ষণগুলো কী
পিসিওএসের ক্ষেত্রে একেকজনের শরীরে একেক ধরনের উপসর্গ ফুটে ওঠে। কারও ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ থাকা বা দেরিতে হওয়া প্রধান লক্ষণ হলেও অন্য কারও ক্ষেত্রে ত্বক বা ওজনের পরিবর্তন বেশি দৃশ্যমান হয়।
ঋতুস্রাবের অনিয়ম
মাসিকের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়াই এই রোগের সবচেয়ে পরিচিত প্রকাশ। দীর্ঘ ব্যবধানে রক্তপাত হওয়া, বছরে স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে অনেক কম মাসিক হওয়া, একটানা কয়েক মাস রক্তপাত বন্ধ থাকা কিংবা শুরু হলে তা অতিরিক্ত দিন স্থায়ী হওয়া—এগুলো অন্যতম লক্ষণ। তবে মানসিক চাপ, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা আকস্মিক শারীরিক ওজনের ওঠানামাও মাসিকের ছন্দ নষ্ট করতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া দরকার।
শরীরে ও মুখে লোমের আধিক্য
নারীর শরীরে যখন অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়, তখন থুতনি, গাল, বুক কিংবা তলপেটে পুরুষালী ধাঁচের মোটা লোম গজাতে থাকে। চিকিৎসার পরিভাষায় একে ‘হিরসুটিজম’ বলা হয়। অনিয়মিত মাসিকের পাশাপাশি হঠাৎ এমন পরিবর্তন দেখলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো জরুরি।
ত্বকে ব্রণের উপদ্রব
বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি দীর্ঘদিন মুখে ব্রণের প্রকোপ চলতে থাকে এবং প্রচলিত চিকিৎসায় তা না কমে, তবে তা পিসিওএসের ইঙ্গিত হতে পারে। অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেনের কারণে ত্বকে তেলের নিঃসরণ বেড়ে লোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়। বংশগত বা ত্বকের অযত্নের কারণেও ব্রণ হতে পারে, তবে হরমোনের বিষয়টি মাথায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
অপ্রত্যাশিত ওজন বৃদ্ধি
বিশেষ করে তলপেট ও কোমরের আশপাশে অতিরিক্ত মেদ জমা এবং চেষ্টা করেও ওজন কমাতে না পারা এই রোগের আরেকটি বড় উপসর্গ। শরীরের কোষে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়ার সঙ্গে এর গভীর যোগ রয়েছে। রক্তের গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করিয়ে শক্তিতে রূপান্তরে সাহায্য করে ইনসুলিন; শরীর এতে সাড়া না দিলে রক্তে এর মাত্রা চড়ে যায়। তবে স্বাভাবিক শারীরিক ওজনের নারীরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
চুল পড়ার ধরন
অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাবে মাথার উপরিভাগ বা সামনের দিকের চুল দ্রুত পাতলা হতে শুরু করে। তবে আয়রনের স্বল্পতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা থাইরয়েডের সমস্যার কারণেও এমন চুল পড়তে পারে।
গর্ভধারণে বাধা
ডিম্বাণু নিয়মিত না ফুটলে প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারণের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত বা জটিল হতে পারে। তবে পিসিওএস থাকা মানেই স্থায়ী বন্ধ্যত্ব নয়। সঠিক চিকিৎসা ও ডিম্বাণু নিঃসরণের ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে বহু নারী মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে থাকেন।
কেন বাড়ে এই জটিলতা?
পিসিওএসের সুনির্দিষ্ট কারণ অজানা থাকলেও কয়েকটি বিষয় এর নেপথ্যে কাজ করে:
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: কোষে ইনসুলিনের যথাযথ কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে শর্করার মাত্রা সামাল দিতে শরীর বাড়তি ইনসুলিন উৎপাদন করে। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন আবার ডিম্বাশয়কে বেশি পরিমাণে অ্যান্ড্রোজেন তৈরিতে প্ররোচিত করে, যা ডিম্বাণুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক সময় ঘাড়, বগল বা ত্বকের ভাঁজে কালচে ও মোটা দাগ পড়া ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের লক্ষণ হতে পারে, যদিও সবার ক্ষেত্রে এমন দাগ দেখা নাও যেতে পারে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে ডিম্বাণুর স্বাভাবিক পরিণতি থমকে যায়। এতে করে ব্রণ, অবাঞ্ছিত লোম এবং মাসিকের অনিয়ম দেখা দেয়।
বংশগত প্রভাব: পরিবারের মা, বোন বা ঘনিষ্ঠ নারী আত্মীয়দের পিসিওএসের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের এই ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। গবেষণায় কিছু জিনের সংশ্লিষ্টতা মিললেও পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই যে রোগটি নিশ্চিতভাবে হবে, তা নয়।
দীর্ঘস্থায়ী মৃদু প্রদাহ: আক্রান্ত নারীদের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি মৃদু প্রদাহের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে কিছু গবেষণায়। এই প্রদাহের কারণে বিপাক ও হরমোন প্রক্রিয়ায় সংকট তৈরি হতে পারে, যদিও প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে প্রদাহই মূল কারণ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

