অরবিড এ্যাপারেলসে আটকে গেল জনতা ব্যাংকের ২৬ কোটি টাকা

রপ্তানি ঋণপত্র ও বিক্রয় চুক্তির ফাঁদে ফেলে জনতা ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান মেসার্স অরবিড এ্যাপারেলস। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির অনাদায়ী দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ১৪৩ টাকায়। নিয়ম ভেঙে ঋণ ছাড়, তদারকির চরম অবহেলা এবং অস্তিত্বহীন কারখানার কারণে পুরো অর্থই এখন গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে।
নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অরবিডকে ১১টি সেলস কন্ট্রাক্ট এবং সাতটি রপ্তানি ঋণপত্রের (এলসি) বিপরীতে ধাপে ধাপে ৮৮টি ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা দেয় জনতা ব্যাংক। পণ্য রপ্তানি করতে না পারায় এই ৮৮টি এলসির দায় মেটাতে ২০২২ সালের ২৬ জুলাই ও ৩১ অক্টোবর ব্যাংকের পক্ষ থেকে সমসংখ্যক ডিমান্ড লোন তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে গ্রাহকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভেঙে ২১টি ডিমান্ড লোন সমন্বয় করা গেলেও বাকি ৬৭টি অপরিশোধিত থেকে যায়। ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত এই ৬৭টি ঋণে দায়ের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৮২ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৫ টাকা। কিন্তু কেন প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানিতে ব্যর্থ হলো, সেই মূল কারণও খতিয়ে দেখেনি সংশ্লিষ্ট শাখা।
অডিট আপত্তির প্রেক্ষিতে শাখা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না নেওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় রপ্তানি সম্ভব হয়নি। এছাড়া ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে সরকারি আদেশে করোনা মহামারির কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ কারণে উৎপাদন সচল রেখে ঋণ শোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ওঠেনি।
তবে ব্যাংকের নিরীক্ষা দল শাখার এই ব্যাখ্যা নাকচ করে দিয়েছে। তাদের মতে, বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য না নেওয়ার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নথিপত্রে মেলেনি কিংবা অডিট জবাবেও দাখিল করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানি না হলে সেই কাঁচামাল বা অবিক্রীত পোশাক কারখানায় ‘ব্যাড স্টক’ হিসেবে থাকার কথা থাকলেও পরিদর্শনে তার কোনো হদিস মেলেনি। নিরীক্ষা দলের ধারণা, যথাযথ তদারকি না থাকায় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আড়ালে কোনো মালামাল না কিনে ‘একমোডেশন বিল’ তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। নয়তো উৎপাদিত পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে টাকা সরিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঋণ মঞ্জুরির নীতিমালা অনুযায়ী, চুক্তির বিপরীতে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বিদেশি ক্রেতার ক্রেডিট রিপোর্ট সংগ্রহ করা এবং ঋণপত্রটি অপরিবর্তনীয় ও নিশ্চিতকৃত (ইরিভোকেবল ও কনফার্মড) হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেলস কন্ট্রাক্ট বা ঋণপত্রের যথার্থতা কোনোভাবেই যাচাই করা হয়নি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন নির্দেশিকা অনুযায়ী রপ্তানি ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে অবহিত করে অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। অবিক্রীত বা উদ্বৃত্ত পণ্যও (স্টকলট) ব্যাংকের নজরদারিতে রাখা হয়নি।
প্রণোদনা ঋণেও অনিয়ম, উধাও কারখানা
করোনা মহামারির সময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়ার নামে অরবিড এ্যাপারেলসকে তিন দফায় মোট ২ কোটি ৮৫ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৮ টাকার বিশেষ প্রণোদনা ঋণ দেয় জনতা ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব খুলে এই অর্থ পরিশোধের শর্ত ছিল। তবে ২০২০ সালের ১৯ মের অফিস নোট বলছে, এসব নথিপত্র ছাড়াই অর্থ ছাড় করা হয়। ফলে এই ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি এবং গ্রাহকের কাছ থেকেও তা আর আদায় করা যায়নি। চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সুদে-আসলে এই দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩ হাজার ৫২৮ টাকায়।
শাখা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিধিমোতাবেক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নগদের মাধ্যমে শ্রমিকদের অর্থ পাঠানো হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৮২৪ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে। তবে রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাকি টাকা আর পাওয়া যায়নি।
এদিকে ২০২৫ সালের ২১ মার্চ নিরীক্ষা দল সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, সেখানে অরবিড এ্যাপারেলসের পাশাপাশি ‘মেসার্স সানমি ফ্যাশনস লিমিটেড’ নামের ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলছে। এলসির দায় তৈরির পর থেকে সেখানে অরবিড এ্যাপারেলসের বাস্তব কোনো অস্তিত্বই ছিল না বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ডিমান্ড লোনের ২২ কোটি ৮২ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৫ টাকা এবং প্রণোদনা ঋণের ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩ হাজার ৫২৮ টাকা মিলে অরবিডের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ২৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ১৪৩ টাকা। বিপরীতে জামানতের পরিমাণ অত্যন্ত অপ্রতুল হওয়ায় পুরো অর্থকেই ব্যাংকের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে নিরীক্ষা বিভাগ। একই সঙ্গে শাখা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ায় দায়ীদের চিহ্নিত করে অর্থ আদায়ের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
শাখা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বকেয়া আদায়ে ইতিমধ্যে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুরো ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে জনতা ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুয়াডাঙ্গা ডট নেট। তিনি লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বললে গত ১৫ অক্টোবর তাকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হয়। তখন তিনি বিষয়টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নজরে এনেছেন এবং উত্তর পেলে জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেন। তবে এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে মেসার্স অরবিড এ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রাহমানের মোবাইল নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

