রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ফেরাতে চাই নতুন নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি

এখন আর ধীরগতিতে চলার সুযোগ নেই। বরং নিজেদের অস্তিত্ব, ভবিষ্যৎ সক্ষমতা এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এসব ব্যাংককে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্ব, যারা প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও সক্ষমতা রাখেন। নেতৃত্বের কাজ শুধু নির্দেশনা দেওয়া কিংবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে কাজ করা।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি। ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা কখনোই কার্যকর নেতৃত্বের পরিচয় হতে পারে না। বরং তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোই হওয়া উচিত ব্যবস্থাপনার প্রধান লক্ষ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সম্ভাবনাময় কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাব নেই। কিন্তু তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। অন্যদিকে, পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা এবং পেশাগত অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নয়।
বিশেষ করে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল অনুমোদিত শূন্য পদের ওপর নির্ভরশীল থাকার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ও জনবলের যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করতে হবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাসময়ে পদোন্নতি ও দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার মূলধন কিংবা আমানত নয়, দক্ষ ও উদ্যমী জনবলও তার অন্যতম শক্তি। সেই শক্তিকে অবহেলা করে কোনো প্রতিষ্ঠানের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কর্মপরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাও জরুরি। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা, উন্নত গ্রাহকসেবা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর করপোরেট চর্চার মাধ্যমে এসব ব্যাংককে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহক যেন সেবার মান, পেশাদারত্ব কিংবা কাজের গতির বিচারে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে কোনো পার্থক্য অনুভব না করেন, সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে। ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রতিফলন থাকতে হবে।
একই সঙ্গে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করাও প্রয়োজন। দেশের ব্যাংকিং খাতের সুস্থ বিকাশের জন্য সব শ্রেণির ব্যাংকেরই ভালো করা জরুরি। এক পক্ষের দুর্বলতা অন্য পক্ষের সাফল্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পূরণ করা সম্ভব নয়। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দক্ষতা, সুশাসন ও সেবার মানের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা গড়ে উঠলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতই উপকৃত হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার উদ্যোগকে তাই কেবল ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ। নতুন নেতৃত্ব কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যমান জনবলকে কাজে লাগাতে পারেন, কর্মপরিবেশে কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন এবং ব্যাংকগুলোকে কতটা ব্যবসাবান্ধব ও গ্রাহকবান্ধব করে তুলতে পারেন তার ওপর। নেতৃত্বের এই পরিবর্তন যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির বাস্তব ধারায় রূপ নেয়, তাহলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনীতিতে তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
লেখক: কৌশিক আজাদ প্রণয়, ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।

