শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

নজরুলের আদর্শ ও চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
নজরুলের আদর্শ ও চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার: ‘নজরুল চর্চা কেবল একদিন বা এক বছরের আয়োজনে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ও চেতনাকে আমাদের নিজেদের জীবনে ও দেশের উন্নয়নে প্রয়োগ করতে হবে।’-এমন আহ্বানের মধ্যদিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ-২০২৬’ উৎসব। গতকাল রোববার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের আয়োজনে ‘জাগো নব সৃষ্টির মহানন্দে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুরু হওয়া এ উৎসব চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র। উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, নজরুল বর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে জেলায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চুয়াডাঙ্গার শিশু-কিশোররা অংশ নিয়ে যে কৃতিত্ব অর্জন করেছে, তা জেলাবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ও চেতনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, নজরুল সাম্য, প্রেম, বিপ্লব ও চেতনার কবি। তার আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নেও কাজে লাগাতে হবে। সপ্তাহব্যাপী এ উৎসবে সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, হামদ-নাত ও নাটক মঞ্চায়নসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজন তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি আরও বলেন, সংস্কৃতির চর্চা সমাজ থেকে অপসংস্কৃতি ও মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে সহায়তা করে। যুবসমাজকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিপুলসংখ্যক প্রতিযোগী উপস্থিত ছিলেন। আয়োজক জেলা পরিষদকে ধন্যবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক সপ্তাহব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ-২০২৬’ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধক জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন। কণ্ঠ শিল্পী হিরণ উর রশিদ শান্তর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি আনন্দিত। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত একটি জায়গা রয়েছে, দামুড়হুদার কার্পাসডাঙ্গায়; যা চুয়াডাঙ্গা জেলায় অবস্থিত। এটা চুয়াডাঙ্গাবাসীর জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমি সম্প্রতি সেই জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার ভেতরে একটি শিহরণ তৈরি হয়েছে যে, আজ থেকে ১০০ বছর আগে আমাদের জাতীয় কবি সেখানে এসেছিলেন। তিনি আড়াই মাস মতো অবস্থান করেছিলেন এবং তার অসামান্য গ্রন্থ পদ্মগোখরা, মৃত্যুক্ষুধা, লিচুচোর এগুলো তিনি সেখানেই লিখেছিলেন। পরিবারসহ তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন। সেই জায়গার সামনে যখন দাঁড়িয়েছি, তখন সেই ১০০ বছর আগের স্মৃতিগুলো অবলোকন করার চেষ্টা করেছি। কেমন ছিলেন কবি, কবির পত্নী, কবির ফ্যামিলি মেম্বার এবং আশেপাশের সেই মানুষগুলো যারা উনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।’ নজরুলের আদর্শ ও সমাজ সংস্কারের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘উনার লেখার মাধ্যমে তিনি আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থাকে সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় আনতে চেয়েছিলেন। সমাজ থেকেও অপশাসন দূর করতে চেয়েছিলেন। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে এই কথাগুলো আমাদের সমাজের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে, বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য হিসেবে উনার এই দর্শনের সাথে আমাদের কাজের ধারাবিনেময় অনেক মিল দেখতে পাই। উনি যেমন চেয়েছেন, আমরাও চাই এই সমাজ থেকে অপশাসন দূর হোক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হোক, সমতা বিধান হোক। আমাদের কাজের যে পরিমণ্ডল, উনার লেখনিতে এইগুলোই উনি পরিপ্রকাশ করেছেন।’ বর্তমান সময়ের যুবসমাজ ও মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে পুলিশ সুপার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি মাদকের বিশাল ভয়াবহতা। আমাদের এই নতুন প্রজন্ম তাদের জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে মাদকের অপব্যবহারে। আমি পুলিশ সুপার হিসেবে জয়েন করেছি গত বছরের আগস্ট মাসে। প্রায় এক মাস হতে চললো। আমাদের এই সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদকের ভয়াবহতা দেখে আমি নিজেও অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমি চেষ্টা করছি, আমার জিরো টলারেন্স, আমাদের বাংলাদেশ পুলিশের আমাদের মহাপরিদর্শক স্যারের সাথে আমাদের গতকালকে (শুক্রবার) মিটিং ছিলো, স্যারও আমাদেরকে একই নির্দেশনা দিয়েছেন-মাদকের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার আমরা করব। আমি আপনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাচ্ছেন বাংলাদেশটাকে একটা নতুন বাংলাদেশে রূপান্তর করার জন্য। আমরাও এই পথের সারথী হয়ে আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে মাদকমুক্ত, গুণ্ডিমুক্ত, কিশোর গ্যাংমুক্ত এবং জুয়ামুক্ত একটা নতুন চুয়াডাঙ্গা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আপনাদের একান্ত সহযোগিতা আমি একান্তভাবে চাচ্ছি। আশাকরি আপনারা আমাকে সেই প্রতিশ্রুতি দেবেন। অভিভাবকদের কাছে আমার একটা অনুরোধ, আপনারা আপনাদের বাচ্চাদেরকে টেককেয়ার করবেন। সংস্কৃতিমনা করেন, তারা যেন রেগুলার খেলাধুলা করে, ফুটবল খেলে। এখানে তো অনেক সুযোগ আছে, যেগুলো অন্য জায়গায় অনেকে পায় না। এগুলো আপনারা খেয়াল রাখবেন, ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কিনা, এটারও অবশ্যই আপনাদেরকে দায়িত্ববান হতে হবে। আমি কথা দিচ্ছি, সন্ধ্যার পরে কোনো রকম উগ্র কোনো ছেলেকে পেলে আমি সরাসরি লকআপে করে দেব। এইদিকে আমি আর কোনো কনসিডার করবো না। সুতরাং বাচ্চাদের দেখার দায়িত্ব আপনাদের, তারা অনলাইনে কি করে, ঘরের দরজা বন্ধ করে মোবাইল ফোনে কি করে-এইগুলো কিন্তু আপনারা সবাই দেখবেন। এই প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেলে খেসারত কিন্তু আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য এই নতুন প্রজন্মকেই সঠিক জায়গায় তৈরি করতে হবে। আশা করি আমরা এইদিকে বিশেষ খেয়াল রাখবো। আপনাদের সহযোগিতা আমি চাচ্ছি। আমি আবারও জেলা পরিষদকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি তারা আগামী এক সপ্তাহ এই অনুষ্ঠানটি কন্টিনিউ করবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজ, জাসাসের সভাপতি সহিদুল হক বিশ্বাস, সংলাপ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সভাপতি নজির আহমেদ, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মো. আলাউদ্দিন, উদীচী জেলা সংসদের সভাপতি হাবিবী জহির রায়হান এবং আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশি প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মুন্সী আবু সাঈফ, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটু, পৌর বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি, বিএনপি নেতা এনামুল হক শাহ মুকুল, জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোমিন মালিতা, জেলা কালচারাল অফিসার সাইফুল হাসান মিলন, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকে খন্দকার অহিদুল আলম (মানি খন্দকার) প্রমুখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে জাসাসের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখা ও স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা নাচ, গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের শুরু পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন জেলা ছাত্রদলের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হাফেজ আবু সুফিয়ান ও গীতা পাঠ করেন কণিকা কর্মকার।

আঞ্চলিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...