ঢাকায় ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচলে কড়াকড়ি, নির্ধারিত হবে এলাকা ও রং

রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার চলাচল শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার জন্য নির্ধারণ করা হবে পৃথক রং। এক অঞ্চলে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য অঞ্চলে চলাচল করতে পারবে না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। তাঁদের পরিচয়পত্র দিয়েই আপাতত কার্যক্রম শুরু হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নতুন ই-রিকশা বিধিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আগামীকাল সোমবার থেকে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে চলাচলরত সব ই-রিকশা বন্ধ করে দেওয়া হবে না। বরং ধাপে ধাপে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা এবং অননুমোদিত ই-রিকশা অপসারণ করা হবে। এ নিয়ে বর্তমান চালকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আট অঞ্চলে আলাদা রং, নির্ধারিত হবে চলাচলের সংখ্যা
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি করে মোট আটটি অঞ্চল নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের ই-রিকশার রং হবে ভিন্ন। কোন এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করবে।
এক সিটি করপোরেশনের অধীনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানোর সুযোগ থাকবে না। একইভাবে নির্ধারিত অঞ্চলের বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে।
নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কত
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার আসনসংখ্যা অনুযায়ী নিবন্ধন ও নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই যাত্রী বহনের উপযোগী ই-রিকশার নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। অন্যদিকে, চার যাত্রী বহনে সক্ষম ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা।
এ ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশার নম্বরপ্লেটের জন্য দিতে হবে এক হাজার টাকা। প্রতিবছর ফিটনেস সনদ গ্রহণের মাধ্যমে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। এসব ফি পরিশোধের দায়িত্ব থাকবে রিকশার মালিকের ওপর।
প্রতিমন্ত্রী জানান, আপাতত নিবন্ধনের সংখ্যার ওপর কোনো নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করা হয়নি। তবে একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন করা যাবে। একজন ব্যক্তি এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট পাঁচটি পর্যন্ত ই-রিকশার মালিকানা নিবন্ধন করতে পারবেন।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য দেওয়া হবে কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বরপ্লেট। এতে মালিক ও চালকের পরিচয়, নিবন্ধন নম্বর, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং চলাচলের অঞ্চলের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। নিবন্ধনের দিন থেকে একটি ই-রিকশার কার্যকর মেয়াদ হবে ১২ বছর। মেয়াদ শেষ হলে নম্বরপ্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে।
চালকদের লাইসেন্স আপাতত স্থগিত
নতুন বিধিমালায় চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিধান রাখা হলেও শুরুতেই তা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক চালককে লাইসেন্সের আওতায় আনতে গেলে সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
প্রথমে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চালকদের পর্যায়ক্রমে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। আপাতত রিকশার মালিকেরা চালকদের পরিচয়পত্র সরবরাহ করবেন।
বুয়েটের নকশা মেনেই পরিবর্তন করতে হবে রিকশা
বর্তমানে সড়কে চলাচলরত ই-রিকশাগুলো নিবন্ধন পেতে হলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত নকশা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সনদ নিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বুয়েট সরাসরি রিকশার কাঠামো পরিবর্তন করবে না। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় নকশা ও কারিগরি নির্দেশনা দিয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে সেই নকশা অনুসারে ই-রিকশা পরিবর্তনের কাজ করবে।
নতুন ই-রিকশা তৈরি ও নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও একই প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হবে। নিবন্ধন ও নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না।
সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় এই গতি ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের বেশি হতে পারবে না। প্রতিটি ই-রিকশায় গতিমাপক অথবা দূরত্বমাপক যন্ত্র রাখার বিধানও রয়েছে।
আসন ও আকার অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস চলাচলের প্রধান সড়ক, ফুটপাত এবং প্রশাসনের নিষিদ্ধ ঘোষিত সড়কে ই-রিকশা চালানো যাবে না।
ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে ই-রিকশার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করবে।
নিবন্ধন ছাড়া রিকশা চালানো, অতিরিক্ত গতিতে চলাচল, নির্ধারিত আসনের বেশি যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার কিংবা অনুমতি ছাড়া মোটর ও কাঠামো পরিবর্তন করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল, ট্রাফিক সংকেত অমান্য এবং দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিলোমিটার হিসেবে নির্ধারণ হবে ভাড়া
ই-রিকশার ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার পর মালিকপক্ষ, ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ঠিক করা হবে। পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় রেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভাড়া নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ভাড়া নির্ধারণের আলোচনায় চালকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেবেন।
চার্জিং স্টেশনেও লাগবে অনুমোদন
ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রগুলোও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের অনুমোদন অথবা ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, এমন চার্জিং স্টেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের সমন্বিত ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দিনের বেলায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ এবং রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করার সুযোগ থাকবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালনা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা বিষয়টি তদারক করবেন।
এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ রোধে পুরোনো ও অকেজো ব্যাটারি যত্রতত্র ফেলা বা পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় বিক্রেতাকে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ব্যাটারি ভাঙা বা গলানো যাবে না।
এক মাস পর অগ্রগতি জানাবে সরকার
রাজধানীতে বর্তমানে কতটি ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা চলাচল করছে কিংবা পুরোনো রিকশাগুলোর কাঠামো পরিবর্তনের কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, এক মাস পর আবার সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করে নিবন্ধন কার্যক্রমের অগ্রগতি, নেওয়া পদক্ষেপ এবং অবৈধ ই-রিকশা অপসারণের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে নতুন বিধিমালা কার্যকর করা হবে। পৌরসভাগুলোতে একই ব্যবস্থা চালু করতে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শহরেও এ বিষয়ে বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
বর্তমানে চলাচলরত ই-রিকশার চালকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিয়ম মেনে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে। একই সঙ্গে অননুমোদিত ই-রিকশা ধাপে ধাপে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

