নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে জামায়াতের বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলছে টিআইবি

বিবৃতিতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০ খ (১) (খ) (আ) ধারায় রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা অর্জনের বিধান রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণে এ বিধান বাস্তবায়নে ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলের রুকন বা সদস্যদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। তবে টিআইবির বক্তব্য, তাদের গবেষণায় দলের মোট নারী সদস্য কিংবা মজলিসে শুরায় নারীদের সংখ্যা পর্যালোচনার বিষয় ছিল না। গবেষণায় দেখা হয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বা কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব।
সংস্থাটির মতে, আরপিওতে কোনো রাজনৈতিক দলে মোট কত শতাংশ নারী সদস্য থাকতে হবে, সে বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই। বরং দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা বা অন্য সাংগঠনিক কাঠামোয় নারী সদস্যের সংখ্যা তুলে ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে নারীর অনুপস্থিতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিবৃতিতে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো জামায়াতে ইসলামীর প্রতিটি স্তরে একই কমিটির মধ্যে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ নেই। দলটির গঠনতন্ত্রে নারীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে পৃথক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের জন্য একটি কমিটি এবং নারী কর্মীদের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। একইভাবে নারীদের জন্য পৃথক মজলিসে শুরা ও কর্মপরিষদও রয়েছে।
তবে নারীদের জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নেই। মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদেও কোনো নারী সদস্য রাখা হয়নি। এমনকি আমিরে জামায়াত, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো নেতৃত্বস্থানীয় পদেও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার চর্চা দেখা যায় না বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির মতে, শুধু নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক কমিটি গঠন করাকে দলের মূল সাংগঠনিক কাঠামোয় নারীদের অন্তর্ভুক্তি বলা যায় না। বরং এভাবে নারীদের নির্দিষ্ট সাংগঠনিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। পৃথক কমিটিকে দলের সর্বস্তরে নারীর প্রতিনিধিত্ব হিসেবে তুলে ধরাকে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
গবেষণায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো আসনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। টিআইবি বলেছে, দলটির দাবি অনুযায়ী ৪৩ শতাংশ সদস্য নারী হলেও তাঁদের মধ্য থেকে একজনকেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতিতে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া জামায়াতের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি বিধান দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার না করা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নিয়মনীতি প্রত্যাখ্যানের বিধান।
গঠনতন্ত্রে ইসলামী আকিদাবিরোধী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত হওয়ার শর্তে অমুসলিম নাগরিকদের সহযোগী সদস্য বা সদস্যপদ দেওয়া এবং মুসলিম ও অমুসলিমদের সদস্যপদের ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত রাখার বিষয়গুলোও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। নারীদের জন্য পৃথক বিভাগ, কমিটি ও কার্যক্রম পরিচালনার বিধানও সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।

