সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধোঁয়াশা সংকট: দূষণকারীদের জবাবদিহি ছাড়া সমাধান অসম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধোঁয়াশা সংকট: দূষণকারীদের জবাবদিহি ছাড়া সমাধান অসম্ভব

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়াশা কেবল একটি পরিবেশগত জরুরি অবস্থা কিংবা কূটনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা নয়। এর প্রভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ও সেবামূলক অবকাঠামোর ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। মূলত পরিবেশ বিনাশের পুরো দায়ভার সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের কাঁধে ঠেলে দেওয়ার এক গভীর অর্থনৈতিক ব্যর্থতাই এতে উন্মোচিত হয়েছে।

কম খরচে জমি সাফ করার অসুস্থ অর্থনীতি

জমির সুশাসন নিশ্চিত না থাকা, বিকল্প পদ্ধতির ব্যয়ভার বেশি হওয়া এবং আইনের ঢিলেঢালা প্রয়োগের কারণে গাছপালা ও বনভূমি পুড়িয়ে সাফ করাকেই সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত মুনাফার সমীকরণটি এখানে অতি সাধারণ—জমি তৈরিতে খরচ বাঁচাও আর পুরো মুনাফা ঘরে তোলো।

অথচ এই আগুনে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ছড়াচ্ছে, মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বন্ধ করতে হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই সাথে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাধ্যমে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে। আর এই বিশাল খরচের কানাকড়িও আগুন লাগানো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কখনো শোধ করে না।

ক্ষতির বিশাল পরিসংখ্যান ও বর্তমান চিত্র

ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৫ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংকটের পর বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, সেবার অন্তত ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল, যা ছিল দেশটির ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সে বছর জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রায় ২৬ লাখ হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে যায়। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, জমি তৈরিতে সস্তা পন্থা বেছে নেওয়া, তীব্র খরা ও আইনি প্রয়োগের দুর্বলতাই ছিল আগুনের মূল কারণ। তাদের আর্থিক হিসাবে কৃষি, বাণিজ্য, পর্যটন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার খরচ এলেও পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

পরিসংখ্যানটি পুরোনো হলেও এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বারবার ফিরে আসা এই বিপর্যয় কতটা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইন্দোনেশিয়ায় পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ আনুমানিক ৬ লাখ ৩৭ হাজার থেকে ৯ লাখ হেক্টরের মধ্যে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, গত ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির সাতটি প্রদেশে ধোঁয়াশার সঙ্গে সম্পর্কিত শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ জন মানুষ।

পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া আগুন ইতিমধ্যে স্থানীয় মানুষ ও তাদের জীবিকাকে তীব্র সংকটের মুখে ফেলেছে। এটি স্পষ্ট যে, ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশীদের কাছে যাওয়ার অনেক আগেই ইন্দোনেশিয়ার প্রান্তিক নাগরিকরা নিজেদের জীবন দিয়ে এর মাশুল দিচ্ছেন।

অর্থনীতির এই বিকৃতিই মূল সমস্যা তৈরি করেছে। আগুন দেওয়ার পেছনে সমাজকে যে চড়া মূল্য দিতে হয়, তা জমি পোড়ানোর সিদ্ধান্তের সময় প্রতিফলিত হয় না। যখন লাভ চলে যায় ব্যক্তির পকেটে আর চিকিৎসার খরচ, আয়ের ক্ষতি এবং পরিবেশগত ধ্বংস সমাজের অন্য সবাইকে বহন করতে হয়, তখন সার্বিক ক্ষতি সীমাহীন হওয়া সত্ত্বেও আগুন লাগানোই লাভজনক কৌশল হিসেবে টিকে থাকে। এই চক্র ভাঙতে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য আগুন ছাড়া জমি তৈরির বাস্তবসম্মত ও সস্তা বিকল্প পৌঁছে দেওয়া দরকার। পাশাপাশি তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বড় করপোরেট কোম্পানিগুলোর ওপর বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক দায় চাপানো প্রয়োজন। তাছাড়া রাজনৈতিক চাপ সামলাতে কেবল ধোঁয়া ওঠার পর দৌড়ঝাঁপ না করে পিটল্যান্ডগুলোর নিয়মিত পুনরুদ্ধার ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বছরজুড়ে ধারাবাহিক নজরদারি রাখা জরুরি।

আসিয়ানের দায়বদ্ধতার ঘাটতি

বাতাসে ভেসে ধোঁয়া এক দেশ থেকে আরেক দেশে অনায়াসেই সীমান্ত পাড়ি দেয়, কিন্তু আইনি দায়দায়িত্ব আর শাস্তির ব্যবস্থা আটকে থাকে জাতীয় সীমানায়। নির্দিষ্ট কোনো আগুনের উৎস খুঁজে বের করা, দায়ী পক্ষকে শনাক্ত করা এবং আন্তঃসীমান্ত ক্ষয়ক্ষতির স্পষ্ট প্রমাণ আন্তর্জাতিকভাবে দাঁড় করানো বেশ কঠিন কাজ। স্যাটেলাইটে ধরা পড়া হটস্পট হয়তো কেবল সতর্কবার্তা দিতে পারে, কিন্তু কার নির্দেশে আগুন লেগেছে কিংবা কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে জড়িত কি না, তা প্রমাণ করতে পারে না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিসংস্থার (আসিয়ান) আইনি কাঠামোর যে অভাব রয়েছে তা নয়। ২০০২ সালে সংস্থাটির 'ট্রান্সবাউন্ডারি হেজ পল্যুশন' চুক্তি সই হয় এবং ২০০৩ সাল থেকে এটি কার্যকর রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ২০১৪ সালে এই চুক্তিটি অনুমোদন করে। তাছাড়া অঞ্চলে একটি ‘হেজ-ফ্রি রোডম্যাপ’ এবং ২০২৩ থেকে ২০৩০ মেয়াদে পিটল্যান্ডের টেকসই ব্যবস্থাপনার কৌশলও প্রণয়ন করা আছে। তবে এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি কখনোই নিয়মিত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ আইন প্রয়োগ এবং দূষণকারীদের কঠোর আর্থিক শাস্তির বিকল্প হতে পারে না।

সারাদেশ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...