এআই ক্যামেরায় মিলছে হাতির আগাম তথ্য, কমছে সংঘাতের ঝুঁকি

শেরপুরে হাতি-মানুষের সংঘাত নতুন কিছু নয়। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যুগ যুগ ধরেই বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে প্রায়ই পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল। এতে ফসলের ক্ষতি ছাড়াও ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। তবে এই সংঘাত কমাতে এবার প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
হাতির চলাচলের পথে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় হাতির উপস্থিতি শনাক্ত হলেই মুহূর্তের মধ্যে মোবাইলে চলে যাচ্ছে সতর্কবার্তা। আগাম খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাচ্ছেন বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। ফলে হাতি-মানুষের সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই খাবারের সন্ধানে এক টিলা থেকে অন্য টিলায় চলাচল করে বন্যহাতির পাল। হাতির পাল যখন পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে, তখনই শুরু হয় সংঘাত। ফসল রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক সময় হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবার মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে আহত ও নিহত হয় বন্যহাতিও।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, গত ১৩ বছরে শেরপুরের এই অঞ্চলে মানুষ-হাতির সংঘাতে ৩৩টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন মানুষ। অর্থাৎ, সংঘাতের প্রতি পর্বেই ক্ষতির মুখে পড়ছে দুই পক্ষ। হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি সংঘাতের কারণে বন্যহাতির মৃত্যুও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় এক আশঙ্কার বার্তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিকভাবে হাতি তাড়ানো হলেও মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরীক্ষামূলকভাবে নালিতাবাড়ীর সমচূড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, ডালুকোণা ও দাওধারা-কাটাবাড়ীসহ হাতির চলাচলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ১৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স ও মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় এই পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এসব ক্যামেরা হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে এক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়। ফলে হাতি লোকালয়ে প্রবেশের আগেই বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করছেন।
স্থানীয়রা জানান, এসব ক্যামেরা লাগানোর ফলে আগে থেকেই জানা যাচ্ছে হাতি কখন লোকালয়ে নামছে। আগে হাতি লোকালয়ে না আসা পর্যন্ত কিছু বোঝার উপায় ছিল না। তবে এই ক্যামেরার সংখ্যা আরও বাড়ানো হলে তারা আরও বেশি উপকৃত হবেন।

সমচূড়া এলাকার বাসিন্দা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সভাপতি আরফান আলী বলেন, আগে হাতি আসার খবর পেতে অনেক দেরি হয়ে যেত। হঠাৎ হাতি সামনে চলে এলে সবাই আতঙ্কে পড়ে যেতাম। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে আগেই খবর পাওয়া যায়। বন বিভাগের লোকজনও দ্রুত চলে আসে। আমরাও স্থানীয়দের সচেতন করতে পারছি। এতে করে এই এলাকায় হাতির হামলা অনেকটাই কমেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা আলমাছ মিয়া বলেন, হাতি এলে আমাদের ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। আবার হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। আগে কখন হাতি আসবে, তা বোঝার উপায় ছিল না। এখন আগাম খবর পাওয়া গেলে আমরা নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারি। আমাদের এলাকায় আরও ক্যামেরা বসানো হলে ভালো হয়।
দাওধারা-কাটাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, হাতি আর মানুষের মধ্যে এমন যুদ্ধ আমরা আর চাই না। জন্মের পর থেকেই এই অবস্থা দেখে আসছি। আমরা চাই, হাতিও বাঁচুক, আমরাও নিরাপদে থাকি। বর্তমানে ক্যামেরা বসানোর পর কিছুটা সুবিধা হচ্ছে। তবে যেসব এলাকায় হাতির উপদ্রব বেশি, সেখানেও এই ব্যবস্থা করা দরকার।

