রোনালদোর পর পর্তুগালের অধিনায়ক হচ্ছেন কে?

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসছে পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণায় খালি হচ্ছে অধিনায়কের জায়গা। ২০০৭ সাল থেকে যে আর্মব্যান্ড পর্তুগিজ মহাতারকার বাহুতে ছিল, এবার সেটি উঠতে যাচ্ছে অন্য কারও হাতে। কিন্তু কে হবেন রোনালদোর উত্তরসূরি? পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অধিনায়কত্ব পাওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বের্নার্দো সিলভা। তবে ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও রুবেন দিয়াসও রয়েছেন আলোচনায়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন ভিডিও প্রকাশ করে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো। ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা এই ফরোয়ার্ডের বিদায়ে পর্তুগিজ ফুটবলে একটি যুগের অবসান ঘটেছে। তার বিদায়ের পর মাঠে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।
পর্তুগিজ বার্তা সংস্থা লুসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোনালদোর পর জাতীয় দলের নতুন অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা বের্নার্দো সিলভার। ৩২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার বর্তমানে পর্তুগালের নিয়মিত খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। দেশের হয়ে এখন পর্যন্ত ১১৫ ম্যাচে মাঠে নেমেছেন তিনি।
লুসা জানিয়েছে, অধিনায়কত্বের তালিকায় বের্নার্দোর পরেই রয়েছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও রুবেন দিয়াস। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিডফিল্ডার ব্রুনো ৯৭টি এবং ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার দিয়াস ৮৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।
তবে বের্নার্দোকে স্থায়ী অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে কোচ হোর্হে জেসুস কিংবা পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে পর্তুগিজ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তার নাম সামনে এলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
বের্নার্দোর এগিয়ে থাকার পেছনে শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, জাতীয় দলের বিদ্যমান নেতৃত্বের ক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। গত জুনে পর্তুগালের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় জেসুস পাঁচজনের একটি নেতৃত্বের দল নির্ধারণ করেছিলেন।
সেই তালিকায় সবার আগে ছিলেন রোনালদো। তার পরেই জায়গা পেয়েছিলেন বের্নার্দো। পরবর্তী তিনজন ছিলেন যথাক্রমে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, রুবেন দিয়াস ও গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা।
এই ক্রম অনুসরণ করা হলে রোনালদোর পর অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার কথা বের্নার্দোরই। যদিও কোচ চাইলে নতুন করে নেতৃত্বের কাঠামো নির্ধারণ করতে পারেন।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে পর্তুগালের অধিনায়কত্ব করেছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজও। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো ও বের্নার্দো শুরুর একাদশে না থাকায় রুবেন দিয়াস নেতৃত্ব দেন। ওই ম্যাচে শারীরিক সমস্যার কারণে খেলতে পারেননি ব্রুনো।
এরপর অক্টোবরে ডেনমার্ক ও নরওয়ের বিপক্ষে পরের দুই ম্যাচে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামেন ব্রুনো। দুই ম্যাচেই শুরুর একাদশের বাইরে ছিলেন বের্নার্দো।
তবে নরওয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ম্যাচে একটি ঘটনা বের্নার্দোর নেতৃত্বের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে। সেদিন দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। মাঠে প্রবেশের পরপরই নিজের বাহু থেকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড খুলে বের্নার্দোর হাতে তুলে দেন ব্রুনো।
ফলে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বের্নার্দো যে তার চেয়ে এগিয়ে, সেই ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। দীর্ঘদিনের প্রচলিত নেতৃত্বের ক্রম মেনে চলার নজির হিসেবেই ঘটনাটিকে দেখছে পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম।
অবশ্য ব্রুনোও নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অধিনায়ক হিসেবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জাতীয় দলের হয়েও একাধিক ম্যাচে আর্মব্যান্ড পরার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবোর বিশ্লেষণও ব্রুনোকে নতুন অধিনায়ক হওয়ার শক্তিশালী সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মাঠে তার নেতৃত্ব, সতীর্থদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
অন্যদিকে রুবেন দিয়াসও পর্তুগালের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা। দীর্ঘদিন ম্যানচেস্টার সিটি ও জাতীয় দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে অধিনায়কত্ব করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
তবে বের্নার্দোর পক্ষে সবচেয়ে বড় বিষয় জাতীয় দলে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিদ্যমান নেতৃত্বের ক্রম। বর্তমানে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলা এই মিডফিল্ডার ২০২৬ সালে ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে স্প্যানিশ ক্লাবটিতে যোগ দেন।
রোনালদোর বিদায়ের পর সাবেক অধিনায়ককে শ্রদ্ধা জানাতেও ভোলেননি বের্নার্দো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় দীর্ঘদিন একই দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন তিনি।
বের্নার্দো লিখেছেন, ‘এত বছর তোমার পাশে খেলতে পারা নিঃসন্দেহে অনেক গর্বের ও আনন্দের ছিল। তুমি আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। সবকিছুর জন্য অনেক ধন্যবাদ।’
শুধু বের্নার্দো নন, রোনালদোকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও রুবেন দিয়াসও। পর্তুগিজ ফুটবলে তার অসামান্য অবদান এবং নতুন প্রজন্মের ওপর প্রভাবের কথা স্মরণ করেছেন তারা।
২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। ২০০৭ সালে প্রথমবার জাতীয় দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পান তিনি। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে পর্তুগালের নেতৃত্বের প্রধান মুখ হয়ে ছিলেন পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফুটবলার।
তার নেতৃত্বে ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জিতেছে দলটি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও গোল করার রেকর্ড নিয়েই জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছেন রোনালদো।
রোনালদোর বিদায়ের পর শুধু অধিনায়কত্ব নয়, তার সাত নম্বর জার্সির উত্তরাধিকার নিয়েও আলোচনা রয়েছে। যদিও গত অক্টোবরে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে ডেনমার্কের বিপক্ষে সাত নম্বর জার্সি পরে খেলেছিলেন রাফায়েল লিয়াও। তবে সেটি স্থায়ীভাবে তাকে দেওয়া হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

