ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধে ট্রাম্পের ঘোষণা কি নির্বাচনী চাল, কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব

ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা চলতি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, ইসরায়েল এখন অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী এবং দেশটির আর এই সহায়তার প্রয়োজন নেই।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, এ সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সমঝোতা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজন হলে দেশটির পাশে দাঁড়াবে ওয়াশিংটন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এ ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তবে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সামরিক সহায়তা বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিদ্যমান সামরিক সহায়তা চুক্তির মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকে সহায়তা বন্ধের ঘোষণা
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক সমালোচনার একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি মিশিগান থেকে নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর আবদুল আল-সাইদের নাম উল্লেখ করেন। প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়েছেন।
ট্রাম্পের প্রশ্ন, ইসরায়েলের যখন আর মার্কিন অর্থের প্রয়োজন নেই, তখন আল-সাইদের মতো সমালোচকদের বক্তব্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র কেন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে?
গাজা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এ বক্তব্য এসেছে। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ মার্কিন ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, ইসরায়েলকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ সালে একই প্রশ্নে এ হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ।
ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের দিন এ ঘোষণা দেওয়ার পেছনে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার সুযোগ কমানোর রাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু নিজেই সহায়তা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী একবারে সহায়তা বন্ধ না করে আগামী ১০ বছরে ধাপে ধাপে তা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
ইসরায়েলকে বছরে কত অর্থ দেয় যুক্তরাষ্ট্র
ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা পেয়েছে।
২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে বর্তমান সামরিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ইসরায়েলকে মোট ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে প্রতিবছর ৩৩০ কোটি ডলার দেওয়া হয় ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং (এফএমএফ) কর্মসূচির আওতায়। এ ছাড়া যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রয়েছে আরও ৫০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে বার্ষিক সহায়তার পরিমাণ ৩৮০ কোটি ডলার।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ শুরুর পর এ নিয়মিত সহায়তার বাইরেও ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সামরিক সহযোগিতা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে এ অর্থ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। এফএমএফ কর্মসূচির আওতায় ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সেবা কিনতে এ অর্থ ব্যবহার করে। ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ব্যবস্থার মাধ্যমে লাভবান হয়।

