পাড়াতলীতে কবির ভিটায়: স্মৃতিতে ‘বায়তুল আমান’ ও দেড় শতকের মসজিদ

গ্রামের শ্যামল শোভা পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছানো গেল সেই কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায়। রিকশাচালক হাত উঁচিয়ে সাদা রঙের এক পুরোনো বসতবাড়ি দেখিয়ে বললেন, এটিই কবির বাড়ি। সামনে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল ইট-সিমেন্টের তৈরি প্রধান ফটক। সেখানে বিশাল কাঠের কপাট থাকলেও তাতে স্পষ্ট অযত্নের চিহ্ন। দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকায় কপাটে ঘুণপোকার উপদ্রব শুরু হয়েছে; বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে পোকার কুরকুর শব্দ। কাঠের এই কাঠামোটি আর কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় জাগে।
কপাটের উপরের অংশে তাকালে নজরে পড়ে দেয়ালে খোদাই করা বাংলা ও আরবি হরফে লেখা বাড়ির নাম—‘বায়তুল আমান’। নামটির মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে এক ধরনের আভিজাত্য। জানা গেল, ১৯৬৪ সালে এই ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। তবে ভেতরে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি। বাড়িটিতে কেউ না থাকায় মূল ফটকে ঝুলছিল মাঝারি সাইজের একটি তালা। সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই দেখতে হলো কবির স্মৃতিমাখা আঙিনা। প্রিয় এই পৈতৃক ভিটায় তিনি শেষবারের মতো এসেছিলেন ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। এর পরের বছরই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
১৪৮ বছরের প্রাচীন মসজিদ
কবির বাড়ির ঠিক উত্তর পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বায়তুন নূর’ পাড়াতলী শাহি জামে মসজিদ। প্রায় দেড় শতক পুরোনো এই মসজিদের ইমামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১২৯৯ হিজরিতে এটি নির্মিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই কবির পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এই ধর্মীয় স্থাপনাটি দেখাশোনা করে আসছেন।
তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই চমৎকার মসজিদের সঙ্গে রয়েছে একটি ছোট মিনার। সিঁড়ি বেয়ে সেই মিনারের ওপরও যাওয়া যায়। আর মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই সবার নজর আটকে যায় চমৎকার কারুকার্যময় মিম্বরে। খিলান আকৃতির নান্দনিক এই নির্মাণশৈলী যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সেখানে নীল, লাল ও সাদা রঙের চমৎকার মিশ্রণ পুরো কাঠামোর শোভা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্মৃতিমাখা পুকুরঘাট
মসজিদের পাশেই রয়েছে গাছগাছালির ছায়ায় ঘেরা শান্ত এক পুকুর। এই জলাশয়ের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে পাকা শানবাঁধানো ঘাট। বিকেল নামতেই পুকুরের জলে আলো আর ছায়ার খেলা তৈরি হয়। স্মৃতির এই ঘাট ও পুকুর নিয়ে কবি নিজেও একসময় লিখেছিলেন:
‘গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকেল বেলা।
দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।’

