‘ভালো সিদ্ধান্ত’ বলছেন সবাই, বাসা ছাড়তে সময় না দেওয়ায় ক্ষোভ

দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরা অন্য কোথাও নিজস্ব বাড়ি বা কম খরচে ফ্ল্যাটে বসবাস করে বরাদ্দ পাওয়া সরকারি কোয়ার্টার পুরোটা চড়া দামে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভাড়া দিয়ে আসছিলেন। আবার কেউ কেউ নিজেরা থাকার পাশাপাশি ছোট পরিবার অথবা ছাত্রীদের সাবলেট হিসেবেও ভাড়া দিতেন। সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত এ বাড়তি আয়ের প্রবণতা ঠেকাতেই সরকার ‘বাংলাদেশ অ্যালটমেন্ট রুলস, ১৯৮২’ এবং সরকারি চাকরিজীবী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকটি কোয়ার্টার পরিদর্শন করার পর অবৈধ ভাড়া প্রদান বন্ধের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেন। সরকারের পক্ষ থেকে গত ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই কলোনিগুলো থেকে সমস্ত অবৈধ ভাড়াটে ও বহিরাগতদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিনের এ অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে দেশের বড় বড় সরকারি কলোনিগুলোতে অভিযানও পরিচালনা করছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর।
নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর যদি কোনো কোয়ার্টারে মূল বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীর পরিবর্তে কোনো বহিরাগত বা সাবলেট পাওয়া যায়, তবে প্রশাসন কোনো প্রকার কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই সরাসরি সেই বাসার বরাদ্দ বাতিল করবে। একইসঙ্গে সরকারি আইন অমান্য করার অপরাধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছে আবাসন পরিদপ্তর।
সরকারের কঠোর এ নির্দেশনার ফলে ইতোমধ্যেই ঢাকার আজিমপুর, মতিঝিল ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে বেশিরভাগ বাসা ছেড়ে দিয়েছেন অবৈধ ভাড়াটিয়ারা। তবে এখনো কিছু বাসায় অবৈধ ভাড়াটিয়া আছেন বলেও জানিয়েছেন অনেকেই।
এদিকে, এত অল্প সময়ের নোটিশে বাসা ছাড়তে বলায় বিপাকে পড়েছেন সাবলেট থাকা ভাড়াটিয়ারা। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা এ সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। সাবলেট থাকা পরিবার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন বাসা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তারেক হাসান নামের এক শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘অনিয়মই যেখানে নিয়মে পরিণত হয়, সেখানে নিয়ম চলতে দেখলেই অবিবেচকরা নাক সিটকায়, এটাই বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কলোনি থেকে অবৈধ সাবলেট নির্মূল করতে যে উদ্যোগ নিয়েছেন, নিঃসন্দেহে এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে শিক্ষার্থীদের হঠাৎ করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের বিকল্প আবাসন খুঁজতে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত ছিল।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা আব্দুল কাদের বলেন, ‘কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নারী শিক্ষার্থীরদের পেছনে সরকার অনেক ব্যয় করে। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন শেষে ঢাকায় থাকার মতো নিরাপদ কোনো জায়গা না থাকায় অনেকেই সরকারি কোয়ার্টারে বেশি টাকা দিয়ে হলেও মাথাগোঁজার ঠাঁই করে নেয়। কিছু শিক্ষার্থী, তাদের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও সরকার কয়েকদিনের নোটিশে কেড়ে নিয়েছে দেখলাম। সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়ার পক্ষপাতী না আমি বা উচ্ছেদের নোটিশেও আমার আপত্তি নেই। আপত্তি কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে, সাত দিনের মধ্যে বের হওয়ার অন্যায্য এবং অমানবিক নোটিশ নিয়ে। এ বিষয়ে সরকারের নারীবান্ধব নীতিমালা কিংবা ব্যবস্থা না থাকা ঘোর আপত্তিকর।’
সুমন শেখ নামের এক শিক্ষার্থী তার স্ত্রীসহ সাবলেট ভাড়া থাকতেন আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের ৬ নম্বর ভবনের একটি কক্ষে। তিনি বলেন, ‘দুই মাসের অ্যাডভান্স হিসেবে আমি ২২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। মাত্র ১৫ দিন থাকতে পেরেছি। এর মধ্যেই বের হওয়ার নোটিশ দিয়েছে। আমি অন্য জায়গায় বাসা খুঁজলেও এখনো পর্যন্ত আমার টাকা ফেরত দেয়নি।’

