ইসরায়েলে এখনো মেলেনি সরকার গঠনের সমীকরণ, চাপে নেতানিয়াহু

প্রেসিডেন্ট হারজগের হাতে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত
নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এরপর তিনি পার্লামেন্টের এমন একজন সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন আদায়ে সক্ষম বলে বিবেচিত হবেন।
প্রাথমিকভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। গাদি আইজেনকটকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তার সামনে আরব দলগুলোর সমর্থন আদায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তার দল লিকুদ ২৭টি আসন পেয়ে নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়ার অধিকার তারই রয়েছে। তিনি অন্য দলগুলোকেও সরকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা তিনি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তার সামনে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
অতি-ধর্মীয় দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
সরকার গঠনের সমীকরণে অতি-ধর্মীয় ইহুদি দল শাস (Shas) এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের (UTJ) অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে আইন পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় এর আগে নেতানিয়াহুর জোট থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল দল দুটি। তাদের অবস্থান পরিবর্তন হলে সরকার গঠনের হিসাবেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের একটি অংশ নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে আইজেনকটের দিকে যেতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে এমনটি ঘটলেও শুধু তাদের সমর্থনে বিরোধী জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে না। সে ক্ষেত্রে অন্তত একটি আরব দলের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।
নেতানিয়াহুর ক্ষমা প্রার্থনা নিয়েও আলোচনা
সরকার গঠনের রাজনৈতিক জটিলতার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর চলমান দুর্নীতি মামলাও আলোচনায় রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
ফলে হারজগকে একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে; কে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পাবেন এবং নেতানিয়াহুর ক্ষমার আবেদন কীভাবে বিবেচনা করা হবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিও প্রভাব ফেলতে পারে
ইসরায়েলের সরকার গঠনের আলোচনা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের আশঙ্কাও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে রয়েছে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের অবস্থান দুর্বল হলে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমর্থন ও নীতিতে কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, বর্তমান আসনসংখ্যার হিসাবে নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার গঠন করা কঠিন। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে একত্র হওয়ার আহ্বান জানানো হতে পারে।
১০ নভেম্বর শপথ নেবে নতুন পার্লামেন্ট
সব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর আগেই সরকার গঠনের বিষয়ে সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের সমঝোতা, অতি-ধর্মীয় দলগুলোর অবস্থান পরিবর্তন কিংবা নতুন কোনো জাতীয় ঐক্য সরকার; এই তিনটি বিষয়ই ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনে কোনো পক্ষের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, নাকি বিরোধী জোট নতুন সরকার গঠন করবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর।

