মধ্যবর্তী নির্বাচনে কেন বারবার বড় ধাক্কা খান মার্কিন প্রেসিডেন্টরা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তার দলের জন্য বরাবরই বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত এই ভোটে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের পাশাপাশি সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্ট নিজে প্রার্থী না হলেও তার প্রশাসনের জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করেন ভোটাররা।
মার্কিন নির্বাচনী ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায়ই কংগ্রেসে আসন হারায়। অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ, প্রশাসনিক বিতর্ক এবং বিরোধী দলের সংগঠিত প্রচারণা এ ধরনের ফলাফলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড থেকে শুরু করে বারাক ওবামা, বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প; বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টদের এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় মধ্যবর্তী নির্বাচনী পরাজয় ঘটে ১৮৯৪ সালে। সে সময় ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের দল প্রতিনিধি পরিষদে ১২৫টি আসন হারায়। ১৮৯৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, বেকারত্ব বাড়ে এবং শিল্প উৎপাদন কমে যায়। এর পাশাপাশি পুলম্যান ধর্মঘট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। নির্বাচনের পর রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৩৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও বড় ধাক্কা খেতে হয় প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে। তার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৭২টি এবং সিনেটে সাতটি আসন হারায়। মহামন্দা মোকাবিলায় নেওয়া নিউ ডিল কর্মসূচি প্রথম দিকে জনপ্রিয়তা পেলেও ১৯৩৭-৩৮ সালে অর্থনীতি আবার সংকটে পড়ে। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকসংখ্যা বাড়ানোর রুজভেল্টের উদ্যোগ ‘কোর্ট-প্যাকিং প্ল্যান’ রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। নিজ দলের অনেক নেতাও এর বিরোধিতা করেন। ফলে কংগ্রেসে তার সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৬টি এবং সিনেটে ১২টি আসন হারায়। যুদ্ধ-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক ধর্মঘট, আবাসনসংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি জনমনে অসন্তোষ তৈরি করেছিল। এর ফলে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ট্রুম্যানের ‘ফেয়ার ডিল’ কর্মসূচিও বাধার মুখে পড়ে। তবে এই নির্বাচনী পরাজয় তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবারও জয়ী হন।
১৯৫৮ সালে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৪৮টি এবং সিনেটে ১৩টি আসন হারায়। সে সময় অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব ও শিল্প উৎপাদন হ্রাস সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক উৎক্ষেপণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
১৯৬৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভিয়েতনাম যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের দলের ওপর। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৪৭টি এবং সিনেটে চারটি আসন হারায়। যুদ্ধের ব্যয়, মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছিল।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ১৯৭৪ সালের নির্বাচন রিপাবলিকানদের জন্য আরেকটি বড় বিপর্যয় হয়ে আসে। রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া জেরাল্ড ফোর্ড দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে নিক্সনকে ক্ষমা করে দেন। এ সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল করে। ওই নির্বাচনে দলটি প্রতিনিধি পরিষদে ৪৮টি এবং সিনেটে পাঁচটি আসন হারায়।
১৯৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন রাজনীতিতে ‘রিপাবলিকান বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পায়। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৪টি এবং সিনেটে আটটি আসন হারায়। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্ক এবং কর ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত অসন্তোষকে কাজে লাগায় বিরোধী রিপাবলিকানরা। নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে ঘোষিত ‘কন্ট্রাক্ট উইথ আমেরিকা’ কর্মসূচিও তাদের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে চার দশকের বেশি সময় পর প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পায় রিপাবলিকানরা।
আধুনিক সময়ে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ধাক্কাগুলোর একটি আসে ২০১০ সালে বারাক ওবামার শাসনামলে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩টি এবং সিনেটে ছয়টি আসন হারায়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর উচ্চ বেকারত্ব, ধীর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার বা ওবামাকেয়ার নিয়ে বিতর্ক সরকারের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলে। একই সময়ে ‘টি পার্টি’ আন্দোলন রিপাবলিকানদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বাচনের পরাজয়কে ওবামা নিজেই ‘শেলাকিং’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকান পার্টিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ইরাক যুদ্ধ, হারিকেন ক্যাটরিনা মোকাবিলায় প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ এবং দুর্নীতির বিতর্কের মধ্যে দলটি প্রতিনিধি পরিষদে ৩০টি ও সিনেটে ছয়টি আসন হারায়।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৪১টি আসন হারালেও সিনেটে দুটি আসন বাড়াতে সক্ষম হয়। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত শুরু করে। ২০১৯ সালে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটে তিনি খালাস পান।
২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে নয়টি আসন হারিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। তবে সিনেটে একটি আসন বাড়াতে সক্ষম হয় দলটি। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। পাশাপাশি গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তও ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করে।

