রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

পুড়ে অঙ্গার মুখ, পায়ের নূপুর আর হাতের ব্রেসলেট দেখে প্রিয়জনদের খুঁজছেন স্বজনেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম
পুড়ে অঙ্গার মুখ, পায়ের নূপুর আর হাতের ব্রেসলেট দেখে প্রিয়জনদের খুঁজছেন স্বজনেরা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের দৃশ্য মুঠোফোনের ভিডিও কলে ওপাশে থাকা স্বজনদের দেখাচ্ছিলেন ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপন। স্ক্রিনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া প্রিয়জনদের নিথর দেহ দেখে ওপাশে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন স্বজনেরা; ভারী হয়ে আসছিল রিপনের কণ্ঠও। একপর্যায়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনিও। মর্গের বাইরে তখন স্বজনদের এমন দীর্ঘশ্বাস আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায় বিষাদময় এই পরিস্থিতি। মর্গে তখন রাখা ছিল আগুনে পুড়ে যাওয়া ১০টি মরদেহ। বাইরে অপলক দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। কারও চোখ মর্গের ফটকে, কেউ আবার দূরদূরান্তে থাকা আত্মীয়দের ফোনে সবশেষ পরিস্থিতি জানাচ্ছেন। সবার মনেই একটি আশা—প্রিয়জনের মরদেহটি শনাক্ত করে শেষবারের মতো বাড়ি নিয়ে যাওয়া।

মর্গের বাইরে একটি গাছের ছায়ায় বসে ছিলেন রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও তার ভাই আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষার কারণে তাদের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হলেও সেখান থেকে যাওয়ার কোনো উপায় তাদের নেই।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের বাইরে অপেক্ষায় কয়েকজন স্বজন। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের বাইরে অপেক্ষায় কয়েকজন স্বজন। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিপন বলেন, ‘আমার ভাইজি মিলিতা মেহজাবিন, ভাগনে নাফিস তেহামী জেরিফ, ভাগনি ফারিহা কবির সাবরিন এবং নাতি ফাইজান নুর—কেউ বেঁচে নেই। তারা কোনো দিন কক্সবাজারে আসেনি। পূজার ছুটিতে এসেছিল।’

ঢাকার উত্তরায় বসবাসকারী রিপনদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। শনিবার সকালে যখন তিনি অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সকাল আটটার দিকে ভাইয়ের একটি ফোনেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আর সময় নষ্ট না করে বিমানে চেপে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন এবং দুপুর ১২টার দিকে সেখানে পৌঁছান। তিনি জানান, তাদের পরিবারের মোট নয়জন সদস্য কক্সবাজারে এসেছিলেন। এর মধ্যে ছয়জনই প্রাণ হারিয়েছেন। বাকি তিনজন আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যাদের পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

শনিবারের পুরো দিনটাই রিপন কাটিয়েছেন হাসপাতালে। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো সদর হাসপাতালের মর্গে এনে রাখা হয়। তবে আগুনের তীব্রতায় শরীর ও মুখমণ্ডল এমনভাবে ঝলসে গেছে যে খালি চোখে কারও পরিচয় নিশ্চিত করার কোনো উপায় ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রিয় মানুষদের চিহ্নিত করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যান রিপন। মুখের আদল বোঝা না গেলেও তাদের ব্যবহৃত পোশাক, হাতের গহনা বা শরীরের বিশেষ কোনো চিহ্নের কথা স্মরণ করতে থাকেন তিনি।

স্বজন শনাক্তের বর্ণনা দিয়ে রিপন বলেন, ‘আমার ভাগনের হাতে সোনালি রঙের একটি ব্রেসলেট ছিল। সেটি দেখে একটি মরদেহকে ভাগনের বলে মনে হয়। ভাইজির বাঁ পায়ে নূপুর ছিল। ভিডিওতে নূপুরটি দেখে ভাতিজিকেও শনাক্ত করেছি।’

পোশাক বা অলংকার দেখে প্রিয়জনকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তা দিয়ে আইনিভাবে মরদেহ হস্তান্তরের সুযোগ নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে না। মর্গের বেশ কয়েকটি মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত না হওয়ায় প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন শোকস্তব্ধ স্বজনেরা।

জাতীয় থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...