রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

ইচ্ছাশক্তির জয়: ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন ডিমলার শেফালী বেগম

নিজস্ব প্রতিবেদক০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
ইচ্ছাশক্তির জয়: ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন ডিমলার শেফালী বেগম

পড়ালেখার কোনো বয়স নেই—এ কথাটি আবারও নতুন করে প্রমাণ করলেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগম। জীবনের ৫২টি বসন্ত পেরিয়ে, দীর্ঘদিনের বিরতি ও পারিবারিক নানা টানাপোড়েন পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন শেফালী। কেবল পাস করাই নয়, তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য এখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। তাঁর এই সাফল্যে শিক্ষক, পরিবার ও পুরো এলাকায় আনন্দের আমেজ বইছে। পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা নানা সংকটের কারণে যাদের পড়াশোনা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল, তাদের কাছে তিনি এখন নতুন এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।

সংগ্রাম পেরিয়ে নতুন পথচলা

শৈশবে শেফালী বেগমের শিক্ষাজীবনের শুরুটা বেশ সম্ভাবনাময় ছিল। তবে খুব ছোট বয়সে বাবাকে হারানোর পর নেমে আসে পারিবারিক সংকট। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পরীক্ষাগুলোতে মেধার স্বাক্ষর রাখলেও একসময় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে গিয়ে বই-খাতা তুলে রাখতে হয় তাঁকে। এরপর বিয়ে, সন্তান আর সংসারের বাস্তবতায় নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন ঢাকা পড়ে যায়।

তবে মনের ভেতরে থাকা শিক্ষার অনুরাগ পুরোপুরি মুছে যায়নি। দীর্ঘ বিরতির পর স্বামী ও তিন সন্তানের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতায় তিনি আবারও পড়ালেখা শুরু করার সাহস পান। সংসারের সব কাজ সামলে বয়সের ব্যবধান ও দীর্ঘ শিক্ষাবিরতিকে তোয়াক্কা না করে নিয়মিত পড়ার টেবিলে বসতেন। সেই নিরলস সাধনার স্বীকৃতি মিলল এবারের ফলাফলে।

শেফালী বেগমের সন্তানেরাও উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। আর মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। সন্তানদের আজকের এই অবস্থানের পেছনেও শেফালীর বড় অবদান রয়েছে।

শিক্ষক ও পরিবারের অনুভূতি

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, “ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের নানা পরিস্থিতির কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়া চালিয়ে যেতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে আমার ভাগ্নি ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া দেখে নিজের মধ্যেও আবার পড়াশোনা করার ইচ্ছা জাগে। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি। আজ জিপিএ ৪.২১ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

স্ত্রীর সাফল্যে দারুণ খুশি স্বামী মকছেদুল আলম। তিনি বলেন, “শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাঁর এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।”

শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজের চোখেও দাদি এখন এক অনন্য উদাহরণ। সে বলে, “আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন—এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।”

আঞ্চলিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...