সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা ডট নেট
শিরোনাম
বিজ্ঞাপন

মাতৃহীন শৈশব আর দারিদ্র্য জয় করে সামিয়ার জিপিএ-৫, নেপথ্যে সৎমায়ের বিরল আত্মত্যাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

ভালাইপুর প্রতিনিধি: শৈশবে মমতাময়ী মাকে হারানোর বেদনা, সংসারে চরম অনটন আর একের পর এক প্রতিকূলতা—কোনো বাধাই থামাতে পারেনি অদম্য মেধাবী সামিয়া আক্তারকে। সব অনিশ্চয়তা পেছনে ফেলে সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে পাওয়া সামিয়ার এই কৃতিত্ব এখন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের হুচুকপাড়া গ্রামের মানুষের মুখে মুখে।

সামিয়া গ্রামের হতদরিদ্র দিনমজুর সাজেদুর রহমানের মেয়ে। মেয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যে আনন্দের বন্যা বইছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে। তবে এই অর্জনের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, এক দিনমজুর বাবার ঘামঝরানো ত্যাগ আর একজন সৎমায়ের বিরল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উপাখ্যান।

সামিয়ার বয়স যখন মোটে আট বছর, তখন তার মা জোছনা আক্তার যুথি মারা যান। খুব অল্প বয়সেই মাতৃহারা হয়ে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ছোট্ট শিশুটিকে। তবে শত কষ্টের মধ্যেও মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রশ্নে কখনো পিছু হটেননি বাবা সাজেদুর রহমান। দিনমজুরির কষ্টার্জিত আয়ে তিল তিল করে মেয়ের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন তিনি। বাবার সেই পরিশ্রমের মান রেখে সামিয়া প্রথমে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। এরপর চুয়াডাঙ্গার আদর্শ মহিলা কলেজে ভর্তি হয়ে সেখান থেকেও এবার এইচএসসিতে একই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে সে।

বাবার স্বপ্ন ও মায়ের আত্মত্যাগ

মেয়ের এমন অর্জনে আবেগাপ্লুত বাবা সাজেদুর রহমান জানান, মাত্র আট বছর বয়সে সামিয়া তার মাকে হারায়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ওর অসম্ভব টান আর মেধা ছিল। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও তাকে আদর্শ মহিলা কলেজে ভর্তি করান। এবার এইচএসসিতেও মেয়ে তাঁর মুখ উজ্জ্বল করেছে। মেয়ের গভীর ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে দিনরাত পরিশ্রম করার শক্তি জুগিয়েছে। দিনমজুরি করে সংসার চালালেও তাঁর একমাত্র স্বপ্ন, সামিয়া যেন কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। অভাব যেন কোনোভাবেই তার পথচলার কাঁটা না হয়, সেই চেষ্টাই তিনি করে যাচ্ছেন।

কথোপকথনের একপর্যায়ে সাজেদুর রহমান তুলে ধরেন পারিবারিক জীবনের এক অনন্য ত্যাগের কথা। তিনি বলেন, সামিয়া যাতে মায়ের অভাব বুঝতে না পারে, সে জন্য তাঁর বর্তমান স্ত্রী আঙ্গুরা খাতুন নিজের কোনো সন্তান নেননি। ছোট থেকেই নিজের গর্ভের সন্তানের মতো পরম স্নেহে আগলে রেখে সামিয়াকে বড় করেছেন তিনি। একজন প্রকৃত মায়ের মতোই তিনি সমস্ত আদর-ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন, যা সামিয়ার এই সাফল্যের পথকে সহজ করেছে।

সামিয়ার বর্তমান মা আঙ্গুরা খাতুন বলেন, সামিয়া তাঁর গর্ভের সন্তান না হলেও তিনি কখনো তাকে পর ভাবেননি। ছোট্ট বয়সে যখন মেয়েটিকে কোলে তুলে নেন, তখন থেকেই নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে শুরু করেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি নিজের মাতৃত্বের স্বপ্নও বিসর্জন দিয়েছেন। পড়াশোনায় মেয়ের এমন আগ্রহ দেখে তাঁর বিশ্বাস ছিল, ও একদিন বড় কিছু করবে। আজকের এই ফলাফলে তাঁর বুক গর্বে ভরে উঠেছে। প্রয়াত মায়ের অভাব হয়তো পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, তবে একজন মা হিসেবে ভালোবাসা ও যত্নে কোনো কমতি রাখেননি তিনি। সামিয়া যেন সৎ মানুষ হয়ে আরও এগিয়ে যায় এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে—এটাই তাঁর পরম চাওয়া।

কৃতজ্ঞতা শিক্ষকদের প্রতিও

সংগ্রাম আর অর্জনের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সামিয়া আক্তার জানায়, মায়ের মৃত্যুর পর বাবার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা দেখে একসময় মনে হয়েছিল লেখাপড়া হয়তো আর এগোবে না। তবে তার বাবা এবং বর্তমান মা কখনো তাকে ভেঙে পড়তে দেননি। তীব্র অনটনের মধ্যেও দুজন তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ আর ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই সে সব সময় পড়াশোনায় নিমগ্ন থেকেছে। আজকের এই ফলাফল তাদেরই ত্যাগের ফল।

বাবা-মায়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সামিয়া। সে জানায়, চুয়াডাঙ্গার আদর্শ মহিলা কলেজের প্রভাষক রুবেল হোসেন ও রুমানা খাতুনসহ কলেজের সব শিক্ষক তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে ঝোড়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রশিদ লাল্টু স্যারের কথা উল্লেখ করে সামিয়া বলে, তিনি সব সময় একজন বাবার মতো পাশে থেকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সবার ভালোবাসা ও দিকনির্দেশনাই তার পথচলাকে মসৃণ করেছে।

দারিদ্র্য আর মাতৃহীনতার বেদনাকে পাশ কাটিয়ে সামিয়ার এই জিপিএ-৫ অর্জন কেবল একটি ভালো ফলাফল নয়; এটি এক পিতার আত্মত্যাগ, এক মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা এবং এক কিশোরীর অবিচল ইচ্ছাশক্তির গল্প। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ভবিষ্যতে বাবা-মায়ের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটানোই এখন সামিয়ার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

আঞ্চলিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
আরও সংবাদ লোড হচ্ছে...